চেঙ্গিস খান ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও ক্ষমতাধর শাসক

চেঙ্গিস খানের আসল নাম তেমুজিন। তিনি মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩শ শতাব্দীর শুরুতে বিশাল এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, যা চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তার সামরিক দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতা তাকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর শাসক করে তুলেছে।

চেঙ্গিস খান ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও ক্ষমতাধর শাসক

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মঙ্গোল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন


মাত্র ৬ বছর বয়সেই তিনি নিজ গোত্রের সঙ্গে শিকার অভিযানে বের হন। ৯ বছর বয়সেই পুরো পরিবারকে হারান তিনি। শুধু তার মা বেঁচে যান। তখনই নিজের পরিবারের হাল ধরতে হয় তাকে। এ বয়সেই তিনি তার সৎ ভাইকে হত্যা করে জেলে যান। মুক্তি পেয়েই মাঠে নেমে পড়েন এই অকুতোভয় ব্যক্তি। ১২০৬ সালে নিজেকে মঙ্গোলদের সর্বময় নেতা ঘোষণা করেন এবং তাদেরকে একত্রিত করে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মঙ্গোল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন।

চেঙ্গিস খান ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিশ্বের প্রায় এক চতুর্থাংশ জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন। তিনি সাম্রাজ্য বাড়াতে গিয়ে নৃশংস হত্যাজজ্ঞ চালিয়েছিলেন। তার সাম্রাজ্য প্রায় দেড়শ বছর টিকে ছিল। তিনি ১২২৭ সালে মারা যান। মৃত্যুর পর জানা যায়, শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার সমাধি হয় মঙ্গোলিয়ার কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে। প্রচলিত তথ্যমতে সমাধির সব তথ্য মুছে দিয়েছে সেনারা। এ জন্য সমাধির উপর দিয়ে তারা এক হাজার গোড়া চালিয়ে দেয়।

বেশ কয়েকজন গবেষক জানান, চেঙ্গিস খান নিজেই চেয়েছিলেন তার সমাধি যেন লুকানোই থাকে। জানা যায় পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদই নাকি গচ্ছিত আছে এই সমাধিতে। তার সব ধনদৌলত এমনকি ৭৮ রাজার মুকুটও সেখানেই নাকি রাখা আছে। চেঙ্গিস খান সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য অত্যন্ত নৃশংস উপায় অবলম্বন করতেন। তার বাহিনী ছিল বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর বাহিনী যারা কোন এলাকা দখল করার পর ব্যাপক গণহত্যা চালাত।

নৃশংসতার কিছু উদাহরণ 


পারস্যের খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস (১২১৯-১২২১) করে ফেলেন এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ হত্যা করেন। এক যুদ্ধে তার জামাতা নিহত হলে, তিনি প্রতিশোধ নিতে ৭ লাখ মানুষকে হত্যা করেন। বাগদাদ, বুখারা ও সমরখন্দ শহর দখলের পর তিনি হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেন এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের হত্যা করে শিক্ষা কেন্দ্র ধ্বংস করেন। ১২১১ থেকে ১২৩৪ সালের মধ্যে চীনের জিন রাজবংশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রায় ২-৪ কোটি মানুষ মারা যায়।

চেঙ্গিস খান অর্থাৎ মহাবিশ্বের এই শাসকের নাম শুনলেই অনেকে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম অপরাজিত জেনারেল। তার সমকক্ষ সেনাপতির সংখ্যা মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। যিনি এককভাবে জয় করেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অঞ্চল। প্রায় ৯০ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা শাসন করেচিল। এর বিস্তৃতি উত্তরে সাইবেরিয়া, পূর্বে কোরিয়া ও চীন, দক্ষিণে ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিমে পারস্য ও আরব পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

ইতিহাস সুষ্টিকারী এই দাপুটে বিজেতার জন্ম হয়েছিল মঙ্গোলিয়ার স্তেপ বা তৃণ চারণভূমিতে। খুব সম্ভবত ১১৬২ সালে তার জন্ম হয়। বলা হয়ে থাকে ওনন নদীর পাড়ে তৃণচারণ ভূমিতেই তার বেড়ে ওঠা। চেঙ্গিস খানের ছোটবেলা ছিল ঘটনাবহুল। পিতা ছিলেন স্থানীয় গোত্রপতি। মঙ্গোল রীতি অনুসারে বার বছর বয়সেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়। তবে কপালে সুখ বেশি দিন টেকে নি। তার পিতা ছিলেন তাতারদের ঘোর শত্রু।

জনশ্রুতি অনুসারে তাতারদের দেয়া বিষমিশ্রিত ঘোড়ার দুধ পানে তার পিতার মৃত্যু হয়েছিল। পিতার মৃত্যুর পর অপ্রাপ্ত তেমুজিনের নেতৃত্ব মেনে নিতে চাইল না তার গোত্রের লোকজন। গোত্রের লোকেরা তাদের পরিবারকে রেখে চলে যেতে শুরু করে। কঠিন এক সময় পার করতে হচ্ছে চেঙ্গিস খানকে। শৈশবের এই কঠিন পরিস্থিতি তাকে তিলে তিলে মজবুত করে গড়ে তুলেছিল ভবিষ্যতের জন্য। ১৭ বছর বয়সে ঘরে তুলে আনলেন বাল্য বধুকে।

চেঙ্গিসের জীবনে হাজার হাজার নারীর সঙ্গ আসলেও বোর্তে ছিল তার প্রথম ও শেষ ভালবাসা। অসংখ্য সন্তানের পিতা হওয়া সত্বেও শুধু বোর্তের গর্ভে জন্ম নেয়া চার ছেলেকেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। বোর্তকে নিয়ে খুব বেশি দিন একসাথে থাকতে পারেনি। প্রতিপক্ষ গোত্রের মধ্যে আক্রমণ চালিয়ে তুলে নিয়ে যায় বোর্তকে। এই ঘোর বিপদে পিতৃবন্ধু তুঘরুল খান এবং তার নিজের ভাই জমুখার শরনাপন্ন হলেন।

অবশেষে উদ্ধার করা হল বোর্তকে। আস্তে আস্তে জমুখা ও তুঘরুলের সহযোগিতায় শক্তিশালী হয়ে উঠলেন তেমুজিন।সেনাবাহিনীতে চেঙ্গিস বংশ পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়ায় রক্তের ভাই জমুখা পরিনত হলেন ঘোর দুশমনে। আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত বেড়েই চলল। ১২০৬ সালের দিকে অর্থাৎ চেঙ্গিসের বয়স যখন প্রায় ৩৫ তখন মঙ্গোলিয়ান স্তেপ দুই শিবিরে বিভক্ত। দুই ভাই দুই শিবিরে বিভক্ত। বেশ কয়েকটা যুদ্ধে জমুখার পরাজয় ঘটে।

তবে চেঙ্গিস খানের কাছে সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। জমুখার যে সেনারা পুরস্কৃত হওয়ার আশায় চেঙ্গিসের কাছে নেতাকে তুলে দিয়েছিল তাদের বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি হয়েছিল খুবই ভয়ঙ্কর। তাদের সবাইকে ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর জমুখাকে মোঙ্গল রীতি অনুসারে পিঠ ভেঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল। জমুখাকে পরাজিত করার পর বাকি বাকি গোত্রগুলো বশ্যতা মেনে নেয়। এ বছরেই তিনি ‘চেঙ্গিস খান’ উপাধি পান।

চেঙ্গিস খান হওয়ার পর তিনি আরও ২১ বছর বেঁচে ছিলেন আর এ সময়টা ছিল তার জীবনের স্বর্ণযুগ। এর মধ্যে তিনি জয় করেছিলেন চীন, ভারত, ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল। এ ছাড়া আফগানিস্তান হয়ে ভারতের পাঞ্জাব পর্যন্ত চলে এসেছিল মোঙ্গল বাহিনী। ককেশাস ও কৃষ্ণসাগরের কিছু অংশ এবং ইউরোপে চেঙ্গিসের জয়রথ ইউক্রেন পর্যন্ত পৌঁছেছিল। অবাক করা ব্যাপার রাশিয়া জয় করতে তাদের একটুও বেগ পেতে হয়নি।

মোঙ্গল বাহিনীর বর্বরতা 


চেঙ্গিস খানের রাজ্য জয় করার পদ্ধতি ছিল ভয়াবহ রকমের বীভৎস। কোন শহর জয়ের আগে মানুষদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জন্য বলা হত। না মানলে শুরু হত অবরোধ, তারপর ক্ষুধার্ত নগরবাসীদের উপর চালানো হত অতর্কিত হামলা। নারী শিশু কেউ তাদের বর্বরতা থেকে বাঁচতে পারেনি। মধ্যযুগের জনবহুল শহরগুলো যেমন মারভ, বেইজিং, সমরখন্দ ও তুর্কমেনিস্তানের উরগেঞ্জ শহর গুলি একদম মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল।

প্রায় ১২ লক্ষ মানুষের এই শহর জয় করার সময় চেঙ্গিস বাহিনীর ৫০ হাজার সৈনিকের প্রত্যেকে গড়ে ২৪ জন করে নিরীহ মানুষ হত্যা করে। যে এলাকায় হামলা হত সে এলাকা জনশুন্য হয়ে পড়ত। পরিণত হত ভুতুড়ে নগরীতে। আজও এশিয়ার কিছু শহরে তাদের ধ্বংসাবশেষ সাক্ষী হিসাবে টিকে আছে। ধারণা করা হয় চেঙ্গিসের বিভিন্ন অভিযানে মারা যায় সাধারণ মানুষ যা তৎকালীন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ।

কোটি কোটি নিরীহ মানুষের হত্যাকারী এক যুদ্ধবাজের পরিচয় নিছক ঘাতক হিসাবে দেখলে হবে না।কারণ চেঙ্গিসের উত্থান পাল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর চেহারা। সূচনা হয়েছিল নতুন এক অধ্যায়ের। তাকে ধিক্কার দেয়া হলেও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। মোঙ্গলদের কাছে তিনি এখনো দেবতুল্য। চেঙ্গিসকে নিয়ে এখনো তারা গর্ব করে। এখনো তাদের কাছে একটি অনুপ্রেরণার নাম।

১৯৯৫ সালে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং সি এন এন গত এক হাজার বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসাবে চেঙ্গিস খানকে ‘ম্যান অব দ্যা মিলেনিয়াম’ হিসাবে নির্বাচিত করে। চেঙ্গিস খান চিলেন পৃথিবীর সর্বকালের সর্ববৃহৎ অবিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তার নৃশংসতা ক্রুসেডারদের তুলনায় খুব যে বেশী ছিলো তা মনে হয় বলা যাবে না। তার শাসনের আওতায় যারা এসেছে তারা অনেক বেশি নিরাপদ, প্রগতিশীল এবং স্বাধীন ছিল।

পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য বিজেতার মৃত্যু হয় ১২২৭ সালে। চেঙ্গিসের সমাধি কোথায় সেটা কেউই জানেনা। কারণ তার শেষকৃত্যে উপস্থিত সবাইকে মেরে ফেলা হয়। তার উত্তরাধিকারীরাও সেটা গোপন করেছিল। তাই আজ পর্যন্ত চেঙ্গিসের সমাধি এক অজানা রহস্য। মঙ্গোলদের কাছে তিনি এক মহানায়ক। তারা মনে করে তিনি শুধু বিশ্ব জয় করেননি বরং তিনি সভ্যতাও গড়েছেন।

চেঙ্গিস খান তাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে এক বীর সেনা। তাই তারা তাঁর সমাধি খোঁজ করতে চায় না। চেঙ্গিস তার নিজের প্রতিকৃতি আঁকা পছন্দ করতেন না। তাই তাঁর কোন আসল ছবি নাই। যেগুলি পাওয়া যায় সবই শিল্পীদের আঁকা ছবি। নিজের জীবন কাহিনী তার জীবদ্দশাতেই লিপিবদ্ধ করার আদেশ দেন। যা ‘সিক্রেট বুক অফ মোঙ্গলস’ নামে পরিচিত।এই রহস্যময় মানুষটিকে জানার একমাত্র বিশ্বস্ত সূত্র এ বইটি।

চেঙ্গিস খান ছিলেন একজন ধর্মনিরপক্ষ মানুষ 


আজীবন তার নিজের ধর্ম শামানে বিশ্বাসী ছিলেন। শামানরা আকাশ দেবতায় বিশ্বাসী ছিলো। যে কোন বিষয়ে দক্ষ, জ্ঞানী, গুণী, চিত্রকর, ভাস্কর, প্রকৌশলী এবং ধর্মীয় গুরুদেরকে তিনি সম্মানের চোখে দেখতেন। তার কড়া নির্দেশ এ ধরনের মানুষদের যেন কোন ভাবেই হত্যা করা না হয় এবং এ ধরনের মানুষদের কর মওকুফের ব্যবস্থা ছিল। তবে শান্তি বিনষ্ট হয় এমন ধর্মীয় অসহিষ্নুতার ব্যাপারে ছিলেন খড়গ হস্ত।

মুহম্মদ শাহ ছিলেন তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের একজন শক্তিশালী সুলতান। প্রথমদিকে চেঙ্গিস খানের সাথে তার বন্ধুত্ব থাকলেও পরবর্তীতে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির ফলে উভয়ের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়। ফলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। সীমান্ত বিরোধ ছাড়াও অন্যান্য কারনে চেঙ্গিস খানকে মুহম্মদ শাহের রাজ্য আক্রমণে প্ররোচিত করেছিল। এশিয়ার প্রচুর ধনরত্ন লুণঠনের পর চেঙ্গিস খান স্বদেশের পধে যাত্রা করেন।

এই দিগ্বিজয়ী বীরের প্রতিটি আক্রমণ ও বিজয় পরিচালিত হত বীভৎস ধ্বংসলীলা ও নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে। এ কারণে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ তাকে ‘আল্লাহর অভিশাপ’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, চেঙ্গিস খানের কারণে ৭০ কোটি টন কার্বন বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। তার আদর্শহীন জুলুমের সাম্রাজ্য মাত্র ১৫০ বছরে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি শিক্ষা ও শিক্ষিতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url