মুসলিম ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধই উটের যুদ্ধ বা উষ্ট্রের যুদ্ধ
৬৫৬ খৃষ্টাব্দে ইরাকের বসরার অদূরে হযরত আলী রা. এবং আয়েশা রা., তালহা রা. ও জুবায়ের রা. এর বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত প্রথম মুসলিম ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধই উটের যুদ্ধ বা উষ্ট্রের যুদ্ধ। আয়েশা রা. উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন বলে এটি উষ্ট্রের যুদ্ধ (জঙ্গে জামাল) নামে পরিচিত।
মুনাফিকরা রাতারাতি আক্রমণ চালালে যুদ্ধ শুরু হয়
তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান রা. এর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে হযরত আয়েশা, তালহা ও জুবায়ের রা. বিদ্রোহ করেন। অন্যদিকে হযরত আলী রা. তখন রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, যা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার প্রায় শেষ দিকে তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ মুনাফিকরা রাতারাতি আক্রমণ চালালে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে তালহা ও জুবায়ের রা. নিহত হন এবং আয়েশা রা. কে সসম্মানে মদীনায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।
ইসলামের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় যা মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয় এই যুদ্ধে। এই যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজারের মত মুসলিম প্রাণ হারায়। এটাই প্রথম যুদ্ধ যেখানে এক মুসলিম আরেক মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে এবং এখান থেকেই প্রথম ফিতনা শুরু হয়। ঐতিহাসিক পি.কে হিট্টি বলেন, এই যুদ্ধের সুদুরপ্রসারী ফলাফল হিসাবে এই যুদ্ধ মুসলমানদের খিলাফতকে দুর্বল করে দিয়েছিল। ওসমান হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
হযরত ওসমান হত্যার বিরোধিতা
আলী রা. প্রায়শ খলিফা ওসমানকে কুরআন ও সুন্না থেকে বিচ্যুত বলে অভিযুক্ত করতেন। তালহা ও জুবায়ের রা. সহ অন্যান্য সাহাবীরা ও এই সমালোচনায় যোগ দিতেন। তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং অবিচারের ব্যাপক অভিযোগ এবং অন্যদিকে নিজ আত্মীয়দের মধ্যে অঢেল উপহার দান সহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছিল। শেষের দিকে ধর্মীয় কাজে নতুন নতুন উদ্ভাবনেরও অভিযোগ আনা হয়।
আলীর সমর্থকরা আলী রা. কে পরবর্তী খলিফা হিসাবে দেখতে চেয়েছিল। যদিও তিনি তাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন এমন কোন প্রমাণ নাই। তবে অনুমান করা হয় যে তিনি বিদ্রোহীদের অভিযোগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এ কারনে স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বিরোধীদের কাছে কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে বিবেচিত হন। কিছু সাহাবী ওসমান রা. কে ক্ষমতাচ্যুত করার আশায় বা তাঁর নীতি পরিবর্তন করতে এই বিদ্রোহ সমর্থন করেছিলেন।
ওসমান রা. এর হত্যাকাণ্ড
বিভিন্ন প্রদেশে শাসনকর্তা নিয়োগ নিয়ে ওসমান রা. এর বিরুদ্ধে একদল বিদ্রোহ শুরু করে। তাদের কথামত মিশরের গভর্নরকে সরিয়ে আবু বকরের ছেলেকে নিয়োগ দিলে তারা শান্ত হবে। কিন্তু তাতেও তারা শান্ত হয়নি। বিদ্রোহীরা নানাভাবে অভিযোগ এনে ওসমান রা. কে অপসারণের দাবী করতে থাকে। ওসমান রা. সবকিছু মীমাংসার আশ্বাস দিলেও ৬৫৬ সালে বাড়ি অবরুদ্ধ করে এবং ঘরে ঢুকে কোরআন তেলাওয়াত করা অবস্থায় হত্যা করে।
ওসমান হত্যার বিচারের বিলম্বতা সহ্য করতে না পেরে আয়েশা রা. তালহা ও জুবায়ের ইরাক ও মদীনা থেকে ৩০০০ সৈন্য সংগ্রহ করে বসরার দিকে অগ্রসর হন। বসরা আক্রমণ করে সেখানকার শাসককে বন্দী করেন। হযরত আলী রা. বিদ্রোহকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারন করতে বাধ্য হন। তিনি তখন কাফেলা নিয়ে মুয়াবিয়াকে দমন করতে যাচ্ছিলেন। বসরা আক্রমণের খবর শুনে তিনি কাফেলা ঘুরিয়ে বসরার দিকে অগ্রসর হন।
পর্যাপ্ত সৈন্য না থাকায় কুফাতে অবস্থান করতে হয়। পরে আলীর পুত্র হাসানের সহযোগিতায় ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে বসরার অভিমুখে যাত্রা করেন। খলিফা হিসাবে আলী রা. আবারো আয়েশা, জুবায়ের এবং তালহা রা. কে প্রস্তাব করেন যে, খিলাফতের প্রাথমিক সংকট কেটে গেলেই তিনি ওসমান হত্যার বিচার করবেন। এই মর্মে তিনি আয়েশার নিকট শান্তি প্রস্তাব করলে তারা তিন জনই শান্তি চুক্তিতে রাজি হন।
শান্তি চুক্তির পর দুষ্কৃতিকারী ইবনে সাবাহ এর সমর্থকরা ধারনা করে বসে চুক্তি হয়ে গেলে ওসমান হত্যা বিচারে তারাই প্রথম শিকার হবে। তাই তারা আলী ও আয়েশা রা. এর শিবিরে আক্রমণ করে বসে। তৃতীয় পক্ষ আক্রমণ করায় দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়। রাতের আঁধারে আক্রমণের ফলে ভোর হতেই প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। দুই মুসলিম দলের মধ্যে যুদ্ধ হলেও কেউ এ যুদ্ধ চায়নি। বরং এটি ছিল তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র।
এই যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই পুনরায় আলী রা. তালহা ও জুবায়েরকে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান ও যুদ্ধ বন্ধ করতে অনুরোধ করেন। আলীর কথা মেনে নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্র ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সময় উভয়ই হত্যার স্বীকার হন। ফলে যুদ্ধ আবারো আয়েশার নেতৃত্বে পুরোদমে চলতে থাকে। প্রচন্ড যুদ্ধের এক পর্যায়ে আয়েশার দল পরাজিত হয়। উভয় দলেরই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। শত্রুপক্ষ এতে খুশি হয় এবং মুসলিম উম্মার মধ্যে ফাটল তৈরি হয়।
হযরত ওসমান নিহতের পর দেশব্যাপী এই হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়। আলী রা. ও ওসমান হত্যার বিচার চাচ্ছিলেন। হযরত ওসমানের দুর্দিনে আলীই ছিলেন তার সাথি। তিনি নিজ দুই পুত্র হাসান ও হুসাইনকে ওসমানের প্রহরায় রেখেছিলেন। আলী কখনেই ওসমানের প্রতিপক্ষ ছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন আগে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তারপর ওসমান হত্যার বিচার করতে। কিন্তু ঘটে যায় হৃদয়বিদারক ঘটনা। যুদ্ধ শেষে আলীর ইমামতিতে উভয়পক্ষের শহীদদের এক সাথে জানাজা হয় এবং দাফন সম্পন্ন হয়।
ঐতিহাসিক মুর বলেন, এই যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজারের মত মুসলিম প্রাণ হারায়। এর মাধ্যমেই ইসলামের প্রথম গৃহ যুদ্ধ বা ইসলামের প্রথম ফিতনা শুরু হয়। ঐতিহাসিক পি. কে হিট্টি বলেন, এই যুদ্ধের সুদুর প্রসারী ফলাফল হিসাবে এই যুদ্ধ মুসলমানদের খিলাফতকে দুর্বল করে দিয়েছিল। সৃষ্টি হয় নানা পথ ও মতের। শিয়া, সুন্নি, খারেজি আরো কত কি। এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে ওসমান হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে।
যুদ্ধের ফলাফল
- হযরত আলীর বিজয় : আলী রা. যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হন এবং তাঁর খিলাফত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
- রাজধানী স্থানান্তর : যুদ্ধের পর খলিফা আলী রা. মদিনা থেকে কুফায় (ইরাক) রাজধানী স্থানান্তর করেন।
- ব্যাপক প্রাণহানি : এই যুদ্ধে উভয়পক্ষের ব্যাপক প্রাণহানি হয়। তালহা ও জুবায়ের সহ অনেক সাহাবীদের মৃত্যু হয়, যা মুসলিম সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
- রাজনৈতিক ফাটল : এই যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মতবিরোধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- অমীমাংসিত যুদ্ধ ও সালিশি : যুদ্ধের ময়দানে আলী রা. বিজয়ের কাছাকাছি থাকলেও, মুয়াবিয়া বাহিনীর পক্ষে কুরআন উচিয়ে সালিশি দাবি করলে যুদ্ধ অমীমাংসিত থেকে যায়।
- খারেজি সম্প্রদায়ের উদ্ভব : আলী রা. এর সেনাবাহিনী থেকে একটি দল সালিশ মানতে নারাজ হয়ে আলাদা হয়ে যায়, যারা খারেজি নামে পরিচিত।
- মুয়াবিয়ার অবস্থান শক্তিশালী হওয়া : কুটনৈতিক চালে মুয়াবিয়া নিজের অবস্থান শক্ত করেন, যা তার জন্য সিরিয়ার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।
- উমাইয়া খিলাফতের পথ তৈরি : এই যুদ্ধ খিলাফতকে দুর্বল করে এবং পরবর্তীকালে উমাইয়া খিলাফতের উত্থান ত্বরান্বিত করে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনকে গভীর করে।
- হযরত আলী হত্যা : হযরত আলীর রা. এর উপদেশমুলক ভাষণ শুনে ১২ হাজার খারেজিদের মধ্যে ৮ হাজার সঠিক পথে ফিরে আসে। অন্যরা বিদ্রোহ করলে ইরাকের নাহরাওয়ান এলাকায় আলীর সাথে যুদ্ধ হয়। মাত্র কয়েকজন ছাড়া সবাই নিহত হয়। বেঁচে যাওয়া তিন খারেজি আলী, মুয়াবিয়া ও আমরু আসকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের একজন বিষমাখা তরবারীর আঘাতে আলী রা. কে নামাজরত অবস্থায় (৬৬১ খৃ:) হত্যা করে।
যুদ্ধের কুফল বলে শেষ করা যাবে না। ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে যুদ্ধ, হানাহানি আর রক্তপাতের ধর্ম হিসাবে আখ্যায়িত করছে। ইসলামের উষালগ্নে এ যুদ্ধ পুরা ইসলাম ধর্মের মর্মবানীর উপরই একটা প্রচন্ড আঘাত। যুগে যুগে মানুষ এই ধর্ম সম্পর্কে একটা ভুল বার্তা পেয়ে আসছে। তবে যুদ্ধের ফলে প্রমাণ হয়েছে, কেউই ভুলের উর্দ্ধে নন। যুগে যুগে ভিন্ন মত থাকবেই। সঠিক পথ খুঁজে নেয়ার একমাত্র পথ কোরআন ও হাদীস।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url