সিফ্ফিনের যুদ্ধ ছিল প্রাথমিক ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম ফিতনা
চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রা. এর খেলাফতকালে তিনটি গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ছিল সিফ্ফিনের যুদ্ধ। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রা. এর হত্যাকাণ্ড এবং তার প্রতিশোধ গ্রহণ করাকে কেন্দ্র করে এ মতবিরোধ শুরু হয়। পরবর্তীতে হযরত আলী রা. ও মুয়াবিয়া সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
এ যুদ্ধ ছিল মুয়াবিয়ার কৃতিত্ব বজায় রাখার জন্য
সিফ্ফিনের যুদ্ধ ছিল প্রাথমিক ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম ফিতনা বা গৃহযুদ্ধ। খলিফা উসমান হত্যার কারনে সংঘটিত এই যুদ্ধ তিন দিন ধরে চলেছিল। তার মৃত্যুর পর মুসলিম সাম্রাজ্যের খিলাফত রাসূল সা. এর চাচাত ভাই এবং জামাতা হযরত আলীর হাতে চলে যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আলী সাম্রাজ্যের উপর নিজের কর্তৃত্ব সুসংহত করতে শুরু করেন। যারা তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন প্রথম মুয়াবিয়া।
৬৫৭ খৃস্টাব্দে (হিজরি ৩৭) উভয়পক্ষ সিফ্ফিনের প্রান্তরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। খলিফা উসমানের হত্যার তথাকথিত প্রতিশোধের কারন দেখিয়ে মুয়াবিয়া এ যদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। বস্তুত এ যুদ্ধ ছিল মুয়াবিয়ার কৃতিত্ব বজায় রাখার জন্য। খলিফা ওমরের সময় থেকেই সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে সেখানে তিনি স্বশাসন চালিয়ে আসছিল। এ কারনে হযরত আলী খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহন করার পরও তিনি বাইয়াত গ্রহন করেনি।
সে মনে করত আলী রা. এর হাতে বাইয়াত নিলে তার কৃতিত্ব থাকবে না। ফলে উসমান হত্যাকে একটা ইস্যু হিসাবে ব্যাবহার করছিল। তার পরবর্তী কার্যাবলী থেকে এটা সুস্পষ্ট বুঝা যায়। সে ক্ষমতা দখলের পর কোনদিন ভুলেও উসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহনের বিষয়টি মুখে আনেননি। মুয়াবিয়া ওমর রা. কে বড় ভয় করতেন। তাই তার শাসনামলে তেমন কোন ব্যতিক্রম করতে সাহস করেনি।
হযরত উসমান রা. মুয়াবিয়ার ঘনিষ্ট আত্মীয় ও কোমল প্রকৃতির শাসক ছিলেন। সেই সুযোগে মুয়াবিয়া নিজেকে বহু সম্পদ ও ব্যাপক সৈন্য ও জনমত গড়ে তুলেন। উদ্দেশ্য একদিন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করা। হযরত আলীর খেলাফতের সময় বিভিন্ন অযুহাতে আলীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। কোন রকম মিমাংশায় রাজী হলেন না। তখন খলিফা আলীর জন্য যুদ্ধ করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে।
উভয় পক্ষ ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরে ‘আর রাক্কার’ নিকট সিফ্ফিন নামক স্থানে মুখোমুখি হন। মুয়াবিয়ার বাহিনী পূর্বে ফোরাত নদীর উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে যাতে আলী রা. এর বাহিনী এক ফোটা পানি না পায়। হযরত আলী লোক মারফত জানালেন, ‘আল্লাহর নেয়ামত পানি থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই’। মুয়াবিয়া জানালেন, ‘যুদ্ধে সব কিছই জায়েজ’। এরপর হযরত ইমাম হোসেন রা. পিতার নির্দেশে যুদ্ধ করে ফোরাত মুক্ত করলেন।
এরপর প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হলো। এ যুদ্ধে অন্যতম ঘটনা হলো রাসূল সা. এর প্রিয় বদলি সাহাবি হযরত আম্মার ও রাসূল প্রেমিক ওয়ায়েশ করনী রা. এর শাহাদাৎ। তখন তাঁর বয়স ছিল ৯১ বছর। যুদ্ধে আলীর বিজয় নিশ্চত জেনে মুয়াবিয়া কুটকৌশলের আশ্রয় নেন। পতাকার শীর্ষে ও বর্শার মাথায় পবিত্র কুরআন শরিফ উত্তোলন করে সন্ধির আহ্বান জানান। এরূপ পরিস্থিতিতে আলী রা. যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হন।
মধ্যস্থতাকারীদের সালিশি বৈঠকে অবমাননা করে মুয়াবিয়াকে খলিফা নিয়োগ করলে আলীর সমর্থকরা ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর ফলে খারেজী নামে একটি দলের সৃষ্টি হয়। এর বেশ কিছুদিন পর হযরত আলী এদের হাতে নামাজ পড়া অবস্থায় মসজিদে শহীদ হন। এরপর ইমাম হাসান জনগনের ইচ্ছাতে খলিফা হলেন। কিন্তু মুয়াবিয়া মেনে নিলেন না। নিজ পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করেন।
ন্যায় ও সত্যের ঝান্ডা সমুন্নত রাখতে হোসেন এগিয়ে আসলেন। ৬৭৯ খৃস্টাব্দে ইয়াজিদ তরবারীর জোরে খলিফা নিযুক্ত হয়ে ইমাম হোসেনকে মেনে নিল না। ইয়াজিদ ছিল নিষ্ঠুর ও বিশ্বাসঘাতক প্রকৃতির। তার সহচরগণ ছিল নীচ,জঘন্য ও নোংরা। আমোদ-প্রমোদ ছিল তাদের আনন্দের বিষয়। তাই কারবালা হয়ে ওঠে অপরিহার্য। সত্য ন্যায়ের সংগ্রামী যোদ্ধা হযরত হোসেন রা. বাধ্য হয়েই যুদ্ধ করেছিলেন। এ জন্য তাঁর পরিবারকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।
এক রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থা
দামেস্কের মসজিদে উসমানের রক্তমাখা জামা ঝুলতে দেখে মুয়াবিয়া বিশাল বাহিনী নিয়ে আলীর মুখোমুখি হওয়ার জন্য যাত্রা করে। প্রতিজ্ঞা করে যে হত্যাকারীদের খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তারা নিজেদের দেশে ঘুমাবে না। আলী নিজে মদিনার সৈন্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। আর মুয়াবিয়া একটি তাবু থেকে যুদ্ধ দেখছিলেন এবং তাঁর সেনাপতি আমর ইবনুল আসকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে দায়িত্ব দেয়া হয়।
এক পর্যায়ে আমর ইবনুল আস শত্রুসেনার ব্যূহের একটি অংশ ছত্রভঙ্গ করে দেন এবং আলীকে হত্যা করার খুব কাছাকাছি চলে আসে। এর জবাবে মালিক ইবনে আশতারের নেতৃত্বে একটি বিশাল আক্রমণ চালানো হয়, যা মুয়াবিয়াকে প্রায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে বাধ্য করে। তিন দিন ধরে যুদ্ধ চলে এবং কোনো পক্ষই সুবিধা করতে পারেনি। তবে হেরে যাওয়ার ভয়ে মুয়াবিয়া মধ্যস্থতার মাধ্যমে মতপার্থক্য মীমাংসার প্রস্তাব দেন।
তিন দিনের লড়াইয়ে মুয়াবিয়ার প্রায় ৪৫০০০ সৈন্য হতাহত হয়, অপর পক্ষে আলী রা. এর সেনাবাহিনীতে হতাহতের সংখ্যা ২৫০০০। যুদ্ধ ক্ষেত্রে সালিশকারীদের সিদ্ধান্তে উভয় পক্ষ দামেস্ক ও কুফায় ফিরে যায়। পরবর্তীতেও তারা কোন সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেনি। ৬৬১ সালে আলীর হত্যাকাণ্ডের পর মুয়াবিয়া খিলাফতের পদে আসীন হন এবং মুসলিম সম্রাজ্যকে পুনরায় একত্রিত করেন। তিনি জেরুজালেমে সিংহাসনে বসে উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। ৬৮০ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত রাজত্ব করেন।
আমাদের জানা দরকার বনি কুরাইশ বংশ দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি হাসেমি ও অপরটি উমাইয়া। ইতিহাস থেকে জানা যায় নবী করিম সা. এর আদি পুরুষ হযরত হাসিম থেকেই এ দুটি গোত্রের মধ্যে বিদ্বেষ চলে আসছে। রাসূল সা. হাসেমি বংশে জন্ম নেয়াতে এ দ্বন্দ চরম আকার নেয়। মুয়াবিয়া ও তার পিতা আবু সুফিয়ান মক্কা বিজয়ের পূর্ব থেকে নবীজির বিরোধিতা করছিল।
বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর তারা আরো বেশি নবী বিদ্বেষী হয়ে পড়ে এবং তাঁকে গোপনে হত্যার চেষ্টা চালায়। আরবের সব গোত্রকে একত্র করে এবং ইহুদীদের সাথে হাত মিলায়। ইসলাম ও মহানবী সা. এর শত্রুদের মধ্যে আবু জেহেল, আবু লাহাব, আবু সুফিয়ান, ওতবা ও তার মেয়ে হিন্দা অন্যতম। এই রাক্ষুসী হিন্দা ওহুদ যুদ্ধে নবীর চাচা হামযা রা. এর কলিজা বের করে চিবিয়ে খায় এবং হাত ও নাক কেটে নেয়।ওই হিন্দার ছেলে হচ্ছে মুয়াবিয়া।
সিফ্ফিন যুদ্ধের কারণ
(ক) উসমান হত্যার বিচারে বিলম্ব করা : হযরত উসমান রা. এর হত্যাকাণ্ড এবং তার প্রতিশোধ গ্রহণ করাকে কেন্দ্র করে এ মতবিরোধ শুরু হয়। দ্রুত বিচারের জন্য জিদ করার কারনে পরবর্তীতে হযরত আলী রা. ও মুয়াবিয়া সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। উসমান রা. একদিন হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন রাসূল সা. বললেন, অবশ্যই এই পদদ্বয়ের নিচ থেকে ফিৎনার আবির্ভাব ঘটবে। সেদিন এই ব্যাক্তি ও তার অনুসারিরা হেদায়েতের উপর থাকবে।
(খ) গৃহবন্দী অবস্থায় অনুমতি নিয়ে আবু হুরায়রা রা. খলীফার নিকট গেলে সেখানে দাঁড়িয়ে বলেন. আমি রাসুলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি, আমার পরে সত্বর তোমরা মতভেদ ও ফিৎনায় জড়িয়ে পড়বা। তখন লোকদের মধ্যে একজন বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সে অবস্থায় আপনি আমাদের কি নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি উসমানের দিকে ইশারা করে বললেন, তোমরা আমীর ও তাঁর তাঁর সাথীদের সাথে থাকবে।
(গ) গৃহবন্দী অবস্থায় উসমান রা. এর গোলাম আবু সালাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা কি আপনার পক্ষে যুদ্ধ করবো না? জবাবে তিনি বললেন, না। রাসূল সা. আমাকে একটি বিষয়ে অছিয়ত করেছেন। অতএব আমি নিজেকে তার উপর অবিচল রাখব। অর্থাৎ আমি যেন খেলাফত পরিত্যাগ না করি এবং তা রক্ষার জন্য যুদ্ধ না করি।
পর্যালোচনা : উপরোক্ত কারনে অনেক সাহাবী উসমান হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন। কারন তারা ভেবেছিলেন যে, উসমানের পক্ষ হওয়ায় তারা হেদায়েতের উপর আছেন। কিন্তু এজন্য আলী রা. এর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া তাঁদের সঠিক হয়নি। কেননা এ সময় খলীফা ছিলেন আলী রা.। তাঁর প্রতি শর্তহীন আনুগত্য অপরিহার্য ছিল। তা ছাড়া উসমান রা. খিলাফত রক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি দেননি।
উভয় দলের অবস্থা
এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী উভয় দলই ইসলামের উপর ছিল। তারা কেউ কাউকে কাফের বলেনি। রাসূল সা. এর ভবিষ্যৎ বাণী, আল্লাহ তার (হাসান) মাধ্যমে বিবদমান দু’দল মুসলমানের মধ্যে সমঝোতা করে দিবেন। আলী রা. এর শাহাদাতের পর হাসান রা. এর মাধ্যমে দু’দলের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল এবং এর ভিত্তিতে পরবর্তীতে মুয়াবিয়া খলীফা হন। যেহেতু উভয়েরই কিবলা এক, নবী ও এক।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url