ফরাসি বিপ্লবে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের যাত্রা শুরু হয়
মানব ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে। ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯ সালের মধ্যে সংঘটিত এই বিপ্লব ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিপ্লবে ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের যাত্রা শুরু হয়।
ফরাসি বিপ্লবের মূলনীতি ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা
কোন সমাজ ব্যবস্থা যখন জরাজীর্ণ এবং গতিহীন হয়ে পড়ে, তখন সমাজের মধ্য থেকে এমন শক্তি জেগে ওঠে যে তার আঘাতে পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ক্ষয়ধরা পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার স্থলে নতুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সমাজের এই মৌলিক পরিবর্তনই হল বিপ্লব। মার্কস বাদীদের মতে শোষিত শ্রেণী শেষ পর্যন্ত অধিকারভোগী শ্রেণীর রাজনৈতিক ও আর্থিক সকল অধিকার বিপ্লবের মাধ্যমে ধ্বংস করে।
শ্রেণী সংগ্রামই বিপ্লবের বাহন। যেমনটি দেখা যায় ফরাসি বিপ্লবে, যেখানে অধিকারভোগী অভিজাত শ্রেণীকে উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণী ক্ষমতাচ্যুত করে। ফ্রান্সে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তা কোন আকষ্মিক কারণে ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিতে যে ব্যবস্থা চলে আসছিল তার সঙ্গে ফ্রান্সের বৃহত্তর জনগণের স্বার্থ যুক্ত ছিল না। শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা গঠনে তৎপর হয় সাধারণ জনগণ।
এই বিপ্লব রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র এবং শোষণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ফরাসি জনগণের দৃঢ় প্রত্যয়। রোমান ক্যাথলিক চার্চ নিজেদের সকল গোঁড়ামী ত্যাগ করে নিজেকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়। এই বিপ্লবকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাসের একটি জটিল সন্ধিক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে পশ্চিমা সভ্যতা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্র থেকে নাগরিকত্বের যুগে পদার্পণ করে।
ফরাসি বিপ্লবের মূলনীতি ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। এ শ্লোগানটি বিপ্লবের চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। যার মাধ্যমে সামরিক ও অহিংস উভয় পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে গোটা পশ্চিমা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এই শ্লেগানটি সকল কর্মীর প্রাণের কথায় পরিণত হয়েছিল। প্রায় ১০ বছরের এই সংগ্রামে গির্জা, বুর্জোয়া শ্রেণী, বণিক শ্রেণী রাজতন্ত্রের শোষণ, দুঃশাসন ও নিপীড়ণ থেকে ফরাসি জাতি জেগে ওঠে কঠোর বিপ্লবে।
রাজপরিবারের বিলাসবহুল জীবন, কৃষকদের ওপর জুলুম, শ্রমিক ও মেহনতি জনতার ওপর অত্যাচার ও করের বোঝা থেকে মুক্তির জন্য পুরো ফরাসি জাতি জেগে ওঠে। দার্শনিক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সশস্ত্র বাহিনী ও জনতা সম্মিলিতভাবে বিজয় লাভ করে এই বিপ্লবের মাধ্যমে। ইতিহাসে এই বিজয় ফরাসি বিপ্লব নামে খ্যাত। ফরাসি দার্শনিকরা এই বিপ্লবে আধুনিক জীবনযাপনের জন্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ভিত্তিকে প্রাধান্য দিয়েছিল।
এই বিপ্লবের চিন্তাশক্তিকে শানিত করেছিল মনীষীদের শাশ্বত ধারণাগুলো। যেমন জন লক গির্জা ও সামন্তপ্রভূর শাসনভার যে ঐশ্বরিক প্রদত্ব, তা অস্বীকার করেন। রূশো ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ, সামাজিক মূল্যবোধ, আধুনিক রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কিত ধারণার উপর গুরুত্ব দেন। মন্টেস্কু একটি জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগের ওপর ক্ষমতার বিভাজনে অবদান রাখায় জনমনে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল।
ফরাসি বিপ্লবকে মানবজাতির অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াই হিসাবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি বছর ১৪ জুলাই ফরাসিরা এই দিনটিকে জাতীয় দিবস বা বাস্তিল দিবস নামে অভিহিত করে থাকে। এই বিপ্লবে আধুনিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদী চেতনা, ধর্মীয় ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সকল জনগণের সমান অধিকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক অবস্থা
ফরাসি রাজার স্বৈরাচারী ক্ষমতা : এ যুগের রাজারা মনে করতেন যে ঈশ্বর রাজাকে নিযুক্ত করেন। তারা ঈশ্বর ছাড়া আর কারও কাছে দায়ী নন। ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা নীতির উপর ভিত্তি করে চতুর্দশ লুই ফরাসি রাজতন্ত্রকে ক্ষমতার আধারে পরিণত করেন। তিনি বলেন, ‘রাজাই হলেন রাষ্ট্র’। প্রতিনিধি সভা না থাকায় রাজার ইচ্ছায় দেশ চলতে থাকে। প্রজাদের সাথে রাজার কোন যোগাযোগ ছিল না।
শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও অভিজাত শ্রেণীর প্রভাব : ফরাসি অভিজাতরা দাবি করত, তারা রাজার সমশ্রেণীভুক্ত লোক। সুতরাং দেশ শাসনের ক্ষেত্রে একমাত্র তারাই রাজাকে সাহায্য করার অধিকারী। রাজবংশের মতো তাদেরও বংশীয় মর্যাদা ছিল। এর ফলে তারা দেশ শাসনের অধিকার ভোগ করত। বিলাসী, রমনীরঞ্জন, অলসতা ইত্যাদি অযোগ্য রাজাদের কারনে রাজার তরফে সকল ক্ষমতা অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা হস্তগত করে।
যাযক শ্রেণীর স্বায়ত্বশাসন : ফ্রান্সের গির্জা স্বয়ং শাসিত সংস্থা। রাজা গির্জার অভ্যন্তরীণ শাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। যাজকেরা গির্জার ভূ-সম্পত্তির ওপর স্বেচ্ছা কর দিত। রাজা কোন কর ধার্য করতে পারতেন না। রাজারা ঐশ্বরিক ক্ষমতা দাবি করলেও বাস্তবে তাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত। ফরাসি রাজতন্ত্র আসলে ছিল সামন্ত রাজতন্ত্র।
প্রাদেশিক সভার ক্ষমতা : ফ্রান্সের প্রদেশগুলিতে যে সভা ছিল সেগুলির সম্মতি ছাড়া রাজার কোনো নির্দেশ প্রদেশগুলিতে কার্যকর করা যেত না। সেখানে স্থানীয় অভিজাতরা প্রাধান্য ভোগ করত। রাজা কোনো নতুন আইন করলে প্রথমে পার্লামেন্ট নামক বিচার সভায় নথিবদ্ধ করতে হত। নতুবা এ আইন বৈধ হত না। পার্লামেন্ট ইচ্ছা করলে রাজার প্রস্তাবিত আইন নাকচ করে দিতে পারত। পার্লামেন্টের বিচারকরা ছিলেন অভিজাত শ্রেণীর।
বিচার ব্যবস্থার দুর্নীতি : ফ্রান্সের বিচার ব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সরকারি কর্মচারীরা ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ও অত্যাচারী। রাজা প্রথম ক্ষমতা প্রয়োগ করে আদালতের শাস্তি মাফ করতে পারতেন এবং দ্বিতীয় ক্ষমতা দ্বরা তিনি যে কোন নাগরিককে বিনা বিচারে কারাগারে আটক রাখতে পারতেন। প্রদেশগুলিতে রাজস্ব আদায়কারীরা ছিল ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত অর্থলোলুপ। তাদের দুর্নিতী ও প্রতাপে লোকদের দুর্গতির সীমা ছিল না।
বৈদেশিক নীতি : এ ক্ষেত্রে পঞ্চদশ লুই ও ষোড়শ লুই ব্যাপক ব্যর্থতার নজির সৃষ্টি করেন। পঞ্চদশ লুই অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধে এবং সপ্তবর্ষের যুদ্ধে পরাজিত হন। ষোড়শ লুই এ পরাজয় থেকে শিক্ষা না নিয়ে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যোগ দেন। এসব যুদ্ধগুলিতে ফ্রান্সের পরাজয়ে ফ্রান্সের মর্যাদা নষ্ট হয়। এ ছাড়া জনস্বার্থের ব্যাপক ক্ষতি হয় ও রাজকোষ শুন্য করে দেয়।
রাজস্ব নীতি : একদিকে অভিজাত ও উচ্চ যাযকরা কর প্রদান থেকে অব্যাহতি ভোগ করত। অন্যদিকে যাদের কর প্রদানের সক্ষমতা ছিল না, যেমন কৃষক ও পাতি বুর্জোয়ারা করের ভারে নিষ্পেষিত হতো। রাজা অভিজাত ও যাযকদের ওপর করারোপ করতে সাহস করেননি। এজন্য সরকার সর্বদাই অর্থসংকটে ভুগত। শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণ এই শোষণব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য তৎপর হয়।
বিপ্লবের প্রেক্ষাপট
বিপ্লবের আগে ফ্রান্সের সাধারণ জনগণকে চরম দারিদ্র, নিপীড়ন এবং বৈষম্যের সাথে জীবনযাপন করতে হতো। কৃষক, শ্রমিক এবং মেহনতি মানুষদের ওপর ছিল চরম করের বোঝা। অন্যদিকে রাজপরিবার এবং ধনী বুর্জোয়া শ্রেণী বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। গির্জা ও ধনী বণিক শ্রেণী সাধারণ জনগণের সম্পদ শোষণ করত। কৃষকদের ওপর জোরপূর্বক শ্রম আদায়, উচ্চকর এবং খাদ্যাভাব মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
এই বিপ্লবে দার্শনিক জন, লক, রুশো এবং মন্টেস্কুদের চিন্তা ও ধারণার মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। বিপ্লবের ঘটনাগুলি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলিকে চিন্তিত করে, যার ফলে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া এবং গ্রেট বৃটেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। রাজা লুই ষোড়শ এবং স্ত্রী মেরি-এন্টোয়েনেটকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বিপ্লবের সন্দেহভাজন শত্রুদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি আলোকায়ন থেকে উদ্বূত নতুন রাজনৈতিক ধারণা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, কৃষির ব্যর্থতা, নিয়ন্ত্রণহীন জাতীয় ঋণ সবই বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপ্লবপূর্ব সরকারের প্রাচীন অভিজাত নীতি ও আইনসমূহ বুর্জোয়া উচ্চাভিলাষের খোরাক যোগাতে শুরু করে। আরেকটি ধারণা বুর্জোয়া ও অভিজাত মহল আন্দোলনে একাত্ম হয়ে সংস্কারের চেষ্টা করতে থাকে।
বিপ্লবের ঠিক আগের মাসগুলোতে বিরাজমান খাদ্য সংকট। অপরদিকে কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ ছিল। যেমন, আলোকসম্পাতের যুগ দ্বারা প্রভাবিতরা বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন শুরু করে। রাজ পরিবারের অতিরিক্ত খরচে রাজকোষ প্রায় শুন্য হয়ে যায়। নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের পুনঃস্থাপন রাজতন্ত্রের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে পড়ে। সমাজের বিশেষ পেশাদার শ্রেণী এবং উঁচু শ্রেনীর লোকদের ব্যাপক সুবিধা দেয়া হচ্ছিল।
প্রচুর নারী নির্যাতন, কৃষক, চাকুরিজীবী এবং কিছু বুর্জোয়া কর্তৃক জমিদারতন্ত্রের উচ্ছেদের পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়। বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারীর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য, যাযক শ্রেণীর ভোগ-বিলাস চরমে ওঠে। অপরদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে একটি জোয়ার সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা ও প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের অনুপ্রেরণা শুরু হয়। এই সমস্যাগুলোর যে কোনটির সমাধানে সম্রাট লুই (১৭৭৪- ১৭৯২) এর চুড়ান্ত ব্যর্থতা।
ফরাসি বিপ্লব শুধুমাত্র ফ্রান্সে নয়, বরং পুরো বিশ্বের ইইতহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শোষণ, নিপীড়ন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ের প্রতীক।ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায়। ধর্মীয় ও ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। বিপ্লবের সময় নীল, সাদা এবং লাল রঙের পতাকা ফরাসি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url