ফেরাউন মূলত কানো ব্যক্তি নয় বরং উপাধি বা খেতাব
ফেরাউন কোন ব্যক্তির নাম নয়। ফেরাউন বলতে হযরত মুসা আ. এর সময়ের মিশরের শাসককে বোঝানো হয়, যিনি বনী ইসরাইলদের উপর অত্যাচার চালাত। ফেরাউন ও তার অত্যাচারী শাসনের ঘটনা কুরআনের পাশাপাশি তাওরাত, যাবুর এবং ইঞ্জিলেও উল্ল্যেখ করা হয়েছে।
মিশরে রাজত্ব করা শাসকদের খেতাব ছিল ফেরাউন
বনি ইসরাইলদের যুগের ধর্ম যাজক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের কর্তা ব্যক্তিদের ফেরাউন উপাধিতে সম্মোধন করা হত। যারাই ঐ অঞ্চলের রাজা হতো তাদেরকে ফেরাউন বলা হত। বাংলা ভাষায় কোনা অত্যাচারী বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যক্তিকে বোঝাতেও ফেরাউন শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ফেরাউন ও তার অনুসারীরা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করত যা আল্লাহর আজাব ডেকে এনেছিল
ফেরাউন মূলত কানো ব্যক্তি নয়। আমালেকা জাতির রাজার খেতাব ছিল ফেরাউন। মিশরের অধিবাসী কিবতীদের রাজার খেতাবও ছিল ফেরাউন। হযরত মুসা আ. এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি রামেসিস ও পিথম নগরী নির্মাণ করেন। সেই হচ্ছে দ্বিতীয় রামেসিস। মুসা আ. মাদিয়ানে অবস্থানকালে ক্ষমতাসীন ফেরাউনের (দ্বিতীয় রামেসিস) মৃত্যু ঘটে।
মুসা আ. এর যুগের ফেরাউনের নাম ছিল ওলীদ ইবনে মাসআব ইবনে রাইয়ান। তার বয়স হয়েছিল ৪০০ বছরেরও অধিক। ইউসুফ আ. এর যুগের ফেরাউনের নাম ছিল রাইয়ান। এ দুই ফেরাউনের মধ্যে ৪০০ বছর সময়ের ব্যবধান ছিল। নাম যাই হোক যুগ যুগ ধরে মিশরে রাজত্ব করা শাসকদের খেতাব ছিল ফেরাউন। তারা ফারাও হিসাবেও পরিচিত ছিল।
ফেরাউন বা ফারাও
গ্রিক-রোমান কর্তৃক বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন মিশরীয় রাজবংশের রাজাদের প্রচলিত উপাধি ছিল ফারাও। মিশরে নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল খৃস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে। নীল নদকে কেন্দ্র করে মিশরে এ সভ্যতা গড়ে উঠে। ৩২০০ খৃস্টপূর্বাব্দে ‘মেনেস’ নামের এক রাজা সমগ্র মিশরকে একত্রিত করে একটি নগর রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। এভাবে মিশরে রাজবংশের সূচনা হয়।
প্রাচীন মিশরের নতুন রাজ্যের সময় ফারাওরা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা ছিল। ফারাওরা বিশ্বাস করত যে তাদের মরণের পর তাদের আত্মা দেবতা হরুসের সাথে মিলে যাবে। এরা নিজেদেরকে সূরযের বংশধর মনে করা হয়। নিজেদেরকে দেবতা বলে মনে করায় তারা বংশের বাইরে কাউকে বিবাহ করত না। ফলে ভাইবোনদের মধ্যেই বিবাহ হত।
ফারাওদের মৃত্যুর পরও জীবন আছে বলে বিশ্বাস করত। সে জীবনেও শাসক হবেন তাদের ফেরাউন। তাই তাদের মৃত্যুর পর পিরামিড বানিয়ে তার নিচে সমাধিকক্ষে এদের দৈনন্দিন জীবনের ভোগ-বাসনার সমস্ত সরঞ্জাম রেখে দিত। মৃতদেহ পচন থেকে রক্ষার জন্য তারা দেহকে মমি বানিয়ে রাখত এবং স্বর্ণালঙ্কারে মুড়ে সমাধিকক্ষের শবাধারে রাখা হত। তারা লাল রঙের মুকুট পরত।
মিশরের সবচেয়ে বড় পিরামিড হলো ফারাও খুফুর পিরামিড। এই পিরামিড গড়ে উঠেছিল ১৩ একর যায়গা জুড়ে। এর উচ্চতা ছিল প্রায় সাড়ে চারশত ফুট। মিশরীয় ভাস্কর্যর সবচেয়ে বড় গৌরব স্ফিংস (পৌরাণিক প্রাণী) তৈরিতে। বহুখন্ড পাথরের গায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল এ ভাস্কর্য। স্ফিংসের দেহ সিংহাকৃতির। আর মাথা ছিল ফারাও এর। ফারাও আভিজাত্যের প্রতীক ছিলো এ মূর্তী।
ফেরাউনের স্বপ্ন ও মুসা আ.
ফেরাউন একদা স্বপ্নে দেখেন, বাইতুল মুকাদ্দাসের দিক থেকে একটা আগুন এসে মিশরের ঘর-বাড়ি ও মূল অধিবাসী কিবতিদের জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অথচ বনু ইসরাইলদের কিছুই হচ্ছে না। ঘুম থেকে উঠেই দেশের বড় বড় জ্যোতিষী ও জাদুকরদের সমবেত করলেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। জ্যোতিষীরা বললেন, অতি সত্বর ইসরাইলদের ঘরে একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। যার হাতে মিশরীয়দের ধ্বংস নেমে আসবে।
ফেরাউন তখন ইসরাইলদের সকল পুত্র সন্তানকে হত্যার উদ্দেশ্যে একদল ধাত্রী ও ছুরিধারী জল্লাদ নিয়োগ দেন। বাড়ি বাড়ি যেয়ে গর্ভবতী নারীদের তালিকা করত। প্রসবের দিন হাজির হয়ে মায়ের সামনে পুত্র সন্তাককে যবাই করে চলে যেত। বনু ইসরাইলের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেল। এমতাবস্তায় মূসার জন্ম হলে তার পিতা মাতা দারণভাবে ভীত হয়ে পড়ে।
সন্তানের প্রাণনাশের আশঙ্কায় আল্লাহর হুকুমে সিন্দুকে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহর কি অপার মহিমা, সিন্দুকটি ভাসতে ভাসতে ফেরাউনের রাজপ্রাসাদের ঘাটে গিয়ে ভিড়ল। ফুটফুটে মায়াভরা শিশুটিকে দেখে ফেরাউনের স্ত্রী ইসরাইলি কন্যা আছিয়া কোলে তুলে নিলেন। তিনি ছিলেন এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। ফেরাউন তাকে জোর করে বিয়ে করেছিল।
শিশু মূসা অন্য কারো দুধ পান না করায় মূসা আ. এর মাকেই ধাত্রী নিয়োগ করা হয়। এভাবেই আল্লাহর কুদরতে মূসা আ. ফেরাউনের ঘরে, তারই অর্থব্যয়ে মায়ের কোলে লালিত পালিত হতে থাকে। অতঃপর বড় হয়ে মূসা আ. অন্যায়ের প্রতিবাদ শুরু করেন। বনি ইসরাইলের উপর নির্যাতন বন্ধের দাবি করেন। ফেরাউনকে অন্যায় ছেড়ে ন্যায়ের পথে আসার আহ্বান জানান।
ফেরাউন ক্ষিপ্ত হয়ে মূসা আ. কে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। তর্ক-বিতর্ক ও জাদুর আয়োজন করেও মূসা আ. এর সঙ্গে সে পেরে উঠতে পারছিল না। মূসা আ. যখন তাদের কাছে লাঠি ছেড়ে দিল তখন সাপ হয়ে তাদের জাদুকে গিলে গিলে সব খেয়ে ফেলল। তখন তারা বলল এতো মিথ্যা জাদু ছাড়া আর কিছুই না। এমন কথা তো আমাদের পিতৃপুরুষদের মধ্যেও শুনিনি।
জাদুকর সহ অনেকেই তার প্রভূত্বকে অস্বীকার করতে থাকে। বিদ্রোহ দমনের জন্য মূসা আ. ও বনি ইসরাইলদের হত্যা করার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। ফেরাউন হামানকে ডেকে বলল, আমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই। এভাবেই ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহংকার করেছিল।
ফেরাউনের সাগরডুবি ও পরিণতি
আল্লাহ প্রত্যেকটি মানুষকে শোধরানোর সুযোগ দেন। মূসা আ. এর মাধ্যমে আল্লাহ ফেরাউনকে সেই সুযোগ দিয়েছিলেন। আল্লাহ স্বীয় একত্ববাদের দাওয়াত নিয়ে ফেরাউনের কাছে মূসা আ.কে পাঠালেন। তাকে বোঝানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন। কিন্তু ফেরাউন নিজেকেই বড় রব হিসাবে দাবি করলেন। জনগণকে ডেকে ঘোষণা করলেন, আমিই তোমাদের শ্রেষ্ট প্রতিপালক।
ফেরাউনের আজাব থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ মূসাকে বনী ইসরাইলসহ মিশর ত্যাগের আদেশ দেন। মূসা আ. ৬ লক্ষ লোকবল নিয়ে বের হলে তাদের শায়েস্তা করার জন্য ফেরাউন ১৬ লাখের বিশাল বাহিনী নিয়ে পিছু ধাওয়া করেন। মূসা আ. তার জাতিকে নিয়ে লোহিত সাগরের তীরে পৌছালে ফেরাউনও তার দলবল নিয়ে সেখানে চলে আসেন।
বনী ইসরাইলের ডানে-বামে পাহাড়, সামনে লোহিত সাগর আর পিছনে ভয়ংকর ফেরাউন বাহিনী। হতবিহ্বল হয়ে মূসা আ. কে বলতে থাকেন, আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম। মূসা বললেন, কখনোই না আমার সাথে আল্লাহ আছেন। তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। আল্লাহ বনী ইসরাইলকে হেফাজতের ইচ্ছা করলেন। তাঁর হুকুমে মূসা আ. লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করলেন।
লাঠি দিয়ে আঘাত করলে সাগরে ১২ টি রাস্তা সৃষ্টি হয়ে যায়। পানি বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতের মতো হয়ে গেল। মূসা আ. তার জাতি সহ শুকনা রাস্তা দিয়ে সমুদ্রের ওপারে চলে গেল। সাগরে রাস্তা দেখে ফেরাউন দাবি করলেন এ রাস্তা আমার তৈরি। অতএব চল এবং ধাওয়া কর। তারা মাঝ সমুদ্রে পৌঁছলে আল্লাহর আদেশে পানি একাকার হয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।
উত্তাল ঢেউয়ে ভয়াল আকার ধারণ করে সাগর। তাদের চিৎকার আর আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস। তাদের সলিল সমাধিতে পরিণত হয় লোহিত সাগর। নিজেকে রব দাবি করা ব্যক্তিই পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। মিশরের সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি আজ সম্পূর্ণ অসহায় ও নিঃস্ব। নিজের জীবন রক্ষায় চিৎকার করছে। এক সময় সে বুঝতে পারে, এক আল্লাহ ছাড়া কেউ তার রক্ষাকারী নাই।
ফেরাউন ঘোষণা করতে থাকে, আমি বিশ্বাস করলাম বনী ইসরাইল যাকে বিশ্বাস করে, নিশ্চয়ই তিনি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নাই। আর আমিও মুসলমানদের অন্তর্ভূক্ত। ফেরাউনের ছলনাপূর্ণ ঈমানের ডাকও কোনো উপকারে আসেনি। হাদিসে আছে, তার ঈমানের চিৎকার শুনে জিবরাইল আ. সমুদ্রের কাদা তার মুখে নিক্ষেপ করেন। যাতে সে ঈমানের কথা বলেতে না পারে।
আল্লাহ তার ধোঁকাপূর্ণ ঈমান কবুল করেননি। ভীষণ দাম্ভিক, সীমাহীন পাষাণ এবং প্রবল অহংকারী ও অত্যাচারী ফেরাউনের পতন হয়। নিজের প্রশংসা ও সম্মান প্রদর্শনে জনগণকে বাধ্য করত। সারা মিশরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে মনোবাঞ্ছনা পূরণ করতে থাকে। দাম্ভিকতা একমাত্র আল্লাহর জন্য। আল্লাহ বলেন, যে আমার বন্ধুদের সঙ্গে শত্রুতা করে আমি তার সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা করি।
ফেরাউন মিসরের জনগণকে বহু দল-উপদলে বিভক্ত করে একটি বৈষম্যপূর্ণ সাম্রাজ্যের জন্ম দেয়। নিজের বংশের লোক কিবতিদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করেন। অপর দিকে অন্যদেরকে সেবা দাসে পরিণত করে। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় ফেরাউন দেশে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল। যাদের পুত্রদের সে হত্যা করত আর কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখত। নিশ্চয় সে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্যতম। (সুরা কাসাস - ৪)
ফেরাউনের পতনের পর হযরত মূসা আ. ও তার গোত্রের লোকেরা মুক্তি পেল। আর দুনিয়ার জালেম শাসকদের শিক্ষার জন্য ফেরাউনের দেহকে অক্ষত রাখা হলো। এখনো মিশরের জাদুঘরে ফেরাউন জালেমদের দেহের মমি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আল্লাহ বলেন, আজ আমি তোমার দেহকে রক্ষা করব যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হতে পারো। (সুরা ইউনুস - ৯২)

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url