আদ জাতি হচ্ছে নূহের পুত্র সামের উত্তরাধিকারী

আদ জাতি হচ্ছে প্রাচীন আরবের এক শক্তিশালী ও ধনী সম্প্রদায়। তারা অসাধারণ শারীরিক শক্তি ও প্রাচর্যের জন্য পরিচিত ছিল। তারা নবী হুদ আ. এর আহ্বান প্রত্যাখান করার কারনে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ভয়াবহ ঝড়ের মাধ্যমে ধ্বংস হয়েছিল। আদ জাতি ছিল নূহ আ. এর বংশধর।

আদ জাতি হচ্ছে নূহের পুত্র সামের উত্তরাধিকারী

আদ জাতি হচ্ছে নূহের পুত্র সামের উত্তরাধিকারী


আদ জাতি হচ্ছে নূহের পুত্র সামের উত্তরাধিকারী, যিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে এসেছিলেন এবং আদিত্যদের পূর্বপুরুষ ছিলেন। আদ জাতি বা আদিত্যদেরকে প্রথম আরব দেশের বাসিন্দা হিসাবে বিশ্বাস করা হয়। তারা প্রাচীন আরব বা ধ্বংসপ্রাপ্ত আরব বাসীসমূহ নামে পরিচিত। তাদের মৃত্যুর পর, তার পুত্র শাদিদ এবং শেদাদ আদিত্যদের উপর উত্তরাধিকারসূত্রে শাসন করেন।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ঐতিহাসিক একটি জাতি হল আদ জাতি। ধারণা করা হয়, এদের যুগ ছিল ঈসা আ. এর প্রায় দুই হাজার বছর আগে এবং নূহ আ. এর সম্প্রদায়ের পরবর্তী সম্প্রদায় হিসাবে গণ্য করা হয়। তাদের বসবাসের কেন্দ্রস্থল ছিল ইয়েমেনের আহকাফ অঞ্চল। এটা হাজরামাউত এর উত্তরে অবস্থিত। বর্তমানে এখানে বালুর স্তুপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট্য নাই।

আদ জাতিকে মৌলিক আরব গোত্রসমূহের মধ্যে একটি ‘বিলীন আরব’ হিসাবে গণ্য করা হয়। আদ ও সামুদ জাতির কথা কুরআনে একসাথে উল্লেখ আছে। তাওরাতে উল্লেখ না থাকায় এ জাতি সম্পর্কে আহলে কিতাবরা কিছুই জানতো না। কিন্তু কুরআনে আদ জাতি সম্পর্কে উল্লেখ থাকায় মুসা আ. এ দুই জাতি সম্পর্কে তার সম্প্রদায়কে অবগত করেন।

আদ সম্প্রদায়ের ১৩ টি গোত্র ছিল। তাদের শক্তি ও প্রাচুর্যের আধিক্যে তারা ভুলে যায় নিজের রবকে। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে অহংকারী। আর ডুবে যায় মূর্তিপূজায়। পবিত্র কোরআনে ১৭টি সুরায় ৭৩টি আয়াতে হুদ আ. ও আদ সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে নুহ আ. এর সম্প্রদায়ের পরে আদ সম্প্রদায় ছিল দ্বিতীয়।

আদ জাতির লোকেরা ছিল মূর্তিপূজক। উল্লেখ্য যে নূহের প্লাবনের পরে এরাই সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা শুরু করে। মূর্তি নির্মাণে তারা ছিল বেশ দক্ষ ও অভিজ্ঞ। আদ সম্প্রদায় তাদের রাজত্বের প্রতাপ ও দাপট, দৈহিক শক্তিমত্তা ও ক্ষমতার অহংকারে এতটাই মত্ত হয়ে পড়েছিল যে তারা সৃষ্টিকর্তাকে একবারেই ভুলে বসেছিল এবং বেশ দাপটের সাথে আল্লাহর নাফরমানি ও শিরকে লিপ্ত ছিল।

আদ জাতির শক্তি ও গৌরব


আদ জাতি সৌদি আরবের যে ইরাম নগরীতে বসবাস করত কোরআনে সেটাকে স্তম্ভসমৃদ্ধ নগরী নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা ছিল দৈত্যকার প্রকৃতির। পাহাড় কেটে ঘর তৈরি এবং সুন্দর স্তম্ভ দিয়ে নগরী সাজাত। কোরআনের বর্ণনায়, যাদের দৈহিক গঠন স্তম্ভ ও খুঁটির ন্যায় দীর্ঘ ছিল এবং যাদের সমান শক্তি ও বলবীর্যে সারা বিশ্বের শহরসমূহে আর কেউ সৃষ্ট হয়নি। সুরা ফজর - ৭-৮।

তারা এত শক্তিশালী ছিল যে হাত দিয়ে গাছ উপড়ে ফেলতে পারত। তাদের সম্পদ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তাদের সময়ের অন্যান্য জাতির তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু এই শক্তি ও সম্পদই তাদের অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভাবতে শুর করে, তাদের শক্তির কাছে কিছুই অসম্ভব নয় এবং তারা আল্লাহর প্রয়োজন মুক্ত।

আদ জাতির দৈহিক গঠন ও শক্তি-সাহসে অন্যসব জাতি থেকে স্বতন্ত্র ছিল। তারা অত্যন্ত দীর্ঘকায় ও অহংকারী ছিল। এমন দীর্ঘকায় ও শক্তিশালী জাতি ইতিপূর্বে প্রথিবীতে সৃষ্টি হয়নি। ইসরাঈলী রেওয়ায়েত থেকে হযরত ইবনে আব্বাস ও মুকাতিল তাদের উচ্চতা বার হাত তথা ১৮ ফুট বলে উল্লেখ করেছেন। এই মরুচারী ও পাহাড়ী আদ জাতির অন্তর ছিল খুব কঠিন।

তারা পৃথিবীতে অহংকার করত এবং বলত, আমাদের চেয়ে শক্তিশালী কে আছে ? তাদের এই অহংকার আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে। তারা মূর্তি পূজায় লিপ্ত হয় এবং আল্লাহর একত্ব বিশ্বাস ত্যাগ করে। তাদের ছিল দস্যু দল, যারা মানুষের সম্পদ লুট করত এবং হত্যা করত। তাদের এই অহংকার ও পাপাচার তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে।

নবী হুদ আ. এর দাওয়াত


আল্লাহ আদ জাতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য নবী হুদকে (আ.) প্রেরণ করেন। তিনি তাদের স্মরণ করে দেন, তাদের শক্তি ও সমৃদ্ধি আল্লাহর নেয়ামত এবং তারা যেন অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। কিন্তু তারা হুদ আ. এর দাওয়াত প্রত্যাখান করে এবং তাঁকে উপহাস করে। তাদের এই উপহাস ও অবাধ্যতা আল্লাহর শাস্তিকে ত্বরান্বিত করে।

হুদ আ. কে কঠোরভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল এবং ঔদ্ধত্য ও গর্বের সঙ্গে বলল, আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? আজ গোটা পৃথিবীতে আমাদের চেয়ে অধিক প্রতাপ ও ক্ষমতার অধিকারী আর কে আছে? কিন্তু হুদ আ. অবিরাম ইসলামের দাওয়াত দিয়েই চললেন। অহংকার ও অবাধ্যতার পরিনাম বর্ণনা করে নূহ আ. এর ঘটনাগুলো মনে করে দিতেন।

আপতিত গজব


হুদ আ. এর দাওয়াত মাত্র ৭০ জন গ্রহণ করলেও বেশির ভাগই তাঁর কথায় ভ্রুক্ষেপ করেনি। অমার্জনীয় হটকারীতার ফলে প্রাথমিক শাস্তি হিসাবে উপর্যুপরি তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেতসমূহ শুষ্ক বালুকাময় মরুভুমিতে পরিণত হয়। বাগ-বাগিচা জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। এতদসত্বেও তারা শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেনি।

অবশেষে তারা বাধ্য হয়ে বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। তখন আকাশে সাদা, কালো ও লাল মেঘ দেখা দেয় এবং গায়েবি আওয়াজ আসে যে তোমরা কোনটি পছন্দ করো? লোকেরা কালো মেঘ কামনা করল। তখন কালো মেঘ আসলো। তারা সন্তষ্ট হয়ে বলল, এটি আমাদের বৃষ্টি দিবে। জবাবে হুদ আ. বললেন, বরং এটা সেই বস্তু যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে।

আল্লাহ হুদ আ. কে তাঁর বিশ্বাসী অনুসারীদের নিয়ে নগরীর কাছে একটি গুহায় আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেন। পরদিন ইরাম নগরীতে এক ভয়াবহ ঝড় আঘাত হানে। কোরআনে এ ঝড়কে ধ্বংসকারী ঝড় নামে বর্ণিত। এই ঝড় সাত দিন ও আট রাত ধরে চলতে থাকে। মেঘের গর্জন ও বজ্রপাতে বাড়ি-ঘর, গাছপালা উপড়ে যায়, মানুষ ও জীবজন্তু আছড়ে পড়ে। এভাবে আদ জাতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়।

কোন কোন তফসীরবিদ বলেন, ইরাম আদ তনয় শাদ্দাদ একটি বেহেস্ত নির্মাণ করেন। বহু স্তম্ভের উপর দন্ডায়মান এবং স্বর্ণ-রৌপ্য ও মণিমুক্তা দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। মানুষ যেন আসল বেহেস্তের পরিবর্তে তার এ বেহেস্তকে পছন্দ করে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে শাদ্দাদ তার সভাসদ নিয়ে বেহেস্তে প্রবেশ করার সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব নাজিল হয়। ফলে সবাই ধ্বংস হয়ে গেল।

যেসব কারনে আদ জাতি ধ্বংস ধ্বংস হয়


১. আদ জাতির উপর প্রেরিত আল্লাহন নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। নিজেদের মনগড়া পথেই অবিচল ছিল।
২. তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে তারা অবমূল্যায়ন করেছিল। শয়তানের আনুগত্য গ্রহণ করে স্বেচ্ছচারী হয়ে উঠেছিল।
৩. দুনিয়ার জীবনকে একমাত্র জীবন ভেবে আখেরাতকে অস্বীকার করেছিল।
৪. আল্লাহর গজব থেকে বাঁচার জন্য কল্পিত উপাস্যকে উসিলা ধরে পূজা-অর্চনা শুরু করে। তারা একত্ববাদকে গ্রহণ না করে বহুত্ববাদকে গ্রহণ করে।
৫. আল্লাহকে বিশ্বাস করত কিন্তু গজবের ক্ষেত্রে তারা নির্ভিক ছিল।
৬. সুউচ্চ টাওয়ার ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করত যা অপচয় ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
৭. বড় বড় প্রাসাদ নির্মাণ করে ভাবত তারা পৃথিবীতে চিরকাল বসবাস করবে।
৮. তারা দুর্বলদের ওপর নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন চালাত।

বিশ্ব পর্যটক ইবনে বতুতা হজে যাওয়ার পথে এখানে পৌঁছে তিনি লিখেছেন, লাল রঙের পাহাড় খোদাই করা আদ জাতির এসব দালান কোঠা দেখে এতটা জীবন্ত মনে হয়ে যেন এখনই বুঝি তা তৈরি করা হয়েছে। এসব স্থানে এখনো মানুষের পরিত্যক্ত হাড়-হাড্ডি দেখা যায়। প্রবল ক্ষমতাধর এসব জাতিরা এখন শুধুই ইতিহাস।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url