সামুদ জাতি একটি প্রাচীন গোত্র বা গোত্র সমষ্টি

সামুদ ছিল প্রাচীন আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রাচীন জাতি বা গোত্র। তারা ছিল নবী সালেহ আ. এর অনুসারী। তারা তাদের নবীকে অবাধ্যতা ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করায় এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের ধ্বংসাবশেষ যেমন ‘মাদায়েন সালেহ’ নামক স্থানটিতে এখনও বিদ্যমান।

সামুদ জাতি একটি প্রাচীন গোত্র বা গোত্র সমষ্টি

সামুদ জাতি আরবের প্রাচীন জাতিগুলির মধ্যে দ্বিতীয়


সামুদ জাতি একটি প্রাচীন গোত্র বা গোত্র সমষ্টি। যাদের নাম পাওয়া যায় সমসাময়িক মেসোপটেমিয়া ও ক্লাসিকাল শিলালিপিতে। খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে শুরু করে খৃষ্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত আরবি লেখাতেও সামুদ জাতির কথা দেখা যায়। পরবর্তীকালে তারা ইসলাম-পূর্ব আরবি কবিতা ও ইসলামী যুগের উৎসগুলিতে স্মরণীয় হয়ে ওঠে, যার মধ্যে কোরআন অন্যতম।

আসিরিয়ার রাজা সারগন-২য় এর খৃস্টপূর্ব ৭১৫ এর লিপিই সামুদ জাতি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরানো প্রমাণ। ইসলামের ইতিহাসে সামুদ জাতির ইতিহাস আরও অনেক আগের, যেখানে তাদের পূর্বপুরুষ বলা হয় ইরাম ও আদ জাতিকে। তারা আরব উপদ্বীপের উপকূলে আকাবা উপসাগরের দক্ষিণে একটি পাথরে এবং বিস্তীর্ণ তটরেখা অঞ্চলে বসবাস করত।

সামুদ জাতি আরবের প্রাচীন জাতিগুলির মধ্যে দ্বিতীয়। আদের পরে এরাই সবচেয়ে বেশী খ্যাতি ও পরিচিতি অর্জন করে। কোরআন নাজিলের পূর্বে এদের কাহিনী সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। জাহেলী যুগের কবিতা, খুতবা ও সাহিত্যে এর ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া যায়। ঈসা আ. এর জন্মের কিছুকাল পূর্বেও এ জাতির কিছু লোক বেচেঁ ছিল।

ইসলামী উৎস অনুযায়ী সামুদ ছিল একটি প্রাচীন আরব গোত্র যারা অতীতে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেরআনে সামুদ গোত্রের নাম ২৬ বার উল্লেখ করা হয়েছে। যাদেরকে বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী জাতি হিসাবে দেখানো হয়েছে। আল্লাহর নবী সালেহ আ. কে অস্বীকার করায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। যেটা আদ, লুত এবং নূহ এর মতো অন্যান্য জাতির সঙ্গেও তুলনা করা হয়।

সামুদ জাতির অবস্থান


আদ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পর হযরত সালেহ আ. সামুদ জাতির নবী হিসাবে প্রেরিত হন। কওমে আদ ও কওমে সামুদ একই দাদা ‘ইরাম’ এর দুটি বংশধারার নাম। তাদের প্রধান শহরের নাম ছিল হিজর যা শামদেশ অর্থাৎ সিরিয়ার অন্তর্ভূক্ত ছিল। আজকের সাউদি আরবের অন্তর্গত মদীনা ও তাবুকের মাঝখানে অবস্থিত ‘মাদায়েনে সালেহ’ এটিই ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় স্থান।

অভিশপ্ত অঞ্চল হওয়ার কারনে এলাকাটি আজও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। কেউ সেখানে বসবাস করে না। ৯ম হিজরীতে তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার পথে মুসলিম বাহিনী হিজর অবতরণ করলে রাসূল সা. সেখানে প্রবেশ করতে নিষেধ করে বলেন, তোমরা ঐসব অভিশপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করো না। তাহলে তোমাদের উপর গযব আসতে পারে, যা তাদের উপর এসেছিল।

সম্ভবত ইতিহাসে তারাই প্রথম জাতি যারা পাহাড়ের মধ্যে ইমারত নির্মানের রীতি প্রচলন করেছিল। আদ জাতিরা যেমন উচু উচু স্তম্ভ বিশিষ্ট ইমারত নির্মাণ করতো। ঠিক তেমনি সামুদ জাতি পাহাড় কেটে তার মধ্যে ইমারত নির্মাণ করতো। এসব গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের শ্রেষ্টত্ব, সম্পদ, শক্তি ও প্রযুক্তির নৈপুন্যের প্রদর্শনী। এ গৃহ নির্মাণ শিল্পটি ছিল ভারতের ইলোরা, অজন্তা গুহার ন্যায়।

সামুদ জাতির লোকেরা যেসব ইমারত নির্মাণ করেছিল সেগুলো এখনো হাজার হাজার একর এলাকা জুড়ে আবস্থান করছে। এ নিঝুম পুরীটি দেখে আন্দাজ করা যায় যে এক সময়ে এ নগরীর জনসংখ্যা চার পাঁচ লাখের কম ছিল না। মদীনা থেকে তাবুক যাওয়ার প্রধান সড়কের ওপরই এ জায়গাটি পড়ে। হেজাজের ব্যবসায়ী কাফেলারা এ ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতো।

হিজরি আট শতকে পর্যটক ইবনে বতুতা হজ্জে যাওয়ার পথে এখানে এসে পৌঁছেন। তিনি লেখেন, এখানে লাল রংয়ের পাহাড়গুলোতে সামুদ জাতির ইমারতগুলো রয়েছে। এগুলো তারা পাহাড় কেটে কেটে তৈরি করেছিল। এ গৃহের কারুকাজ এখনো এমন উজ্জল ও তরতাজা হয়ে আছে যেন মনে হয় আজই এগুলো খোদাই করা হয়েছে।

সামুদ জাতি যেমন উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি লাভ করেছিল অন্যদিকে সমাজে শিরক ও মূর্তি পূজার প্রবল জোয়ার চলতে থাকে। পৃথিবী ভরে উঠতে থাকে জুলুম-নিপীড়নের প্রাবল্যে। সবচেয়ে অসৎ দুষ্কৃতিকারীরা নেতৃত্বের আসনে চলে আসে। সালেহ আ. এর দাওয়াত কেবলমাত্র নিম্নশ্রেণীর দুর্বল লোকদেরকেই প্রভাবিত করেছিল।

তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূল সা. যখন এ এলাকা অতিক্রম করছিলেন তখন তিনি একটি কুয়ার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলেন, এ কুয়াটি থেকে সালেহ আ. এর উটনী পানি পান করতো। তিনি সাহাবীদেরকে একমাত্র এ কুয়াটি থেকে পানি পান করতে বলেন। অন্য সমস্ত কুয়া থেকে পানি পান করতে নিষেধ করলেন। এটি এমন একটি জাতির এলাকা যাদের উপর আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিল।

এ স্থানটি অতিক্রম করার সময় তোমরা দ্রুত চলে যাও। কারন এটা ভ্রমণের জায়গা নয় বরং কান্নার জায়গা। অর্থাৎ আদ জাতির পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। বিপর্যয় সৃষ্টি করার জন্য আদ জাতিকে ধ্বংস করে দিয়ে যেমন তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই মহা শক্তিধর আবার তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে অন্যদেরকে স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন।

নবী সালেহ আ. এর মুজিজা


সামুদ জাতি সালেহ আ. কে নবুয়্যতের প্রমাণ হিসাবে মুজিজা বা অলৌকিক কোন ঘটনা দেখাতে বলে। সালেহ আ, জিজ্ঞাসা করেন, তারা কী ধরনের মুজিজা দেখতে চায়? তারা একটি বৃহৎ পাথর দেখিয়ে বলে, তিনি যেন ঔ পাথর থেকে একটি উটনি বের করে আনেন। সালেহ আ. আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তাদের শর্ত অনুযায়ী সেই পাথর থেকে একটি উটনি বের হয়ে আসে।

তাদের শর্ত অনুযায়ী ঠিক যেমন চেয়েছিল তাদের চোখের সামনেই তা ঘটে গেল। তারা বিষ্ময়ে অবিভূত হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ঈমান আনে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ সুস্পষ্ট মুজিজা দেখার পরও কুফরিতে অটল থাকে। সালেহ আ. বলেন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিদর্শন। এটা আল্লাহর উষ্ট্রী। এটাকে কোনভাবে কষ্ট দিলে আল্লাহ তাআলার শাস্তি নেমে আসবে।

উটনিটি প্রচুর পানি পান করত। সালেহ আ. নিয়ম করে দেন, সামুদের এলাকার কূপ থেকে একদিন পানি পান করবে, অন্যদিন সামুদ জাতির অন্যান্যরা নিজেদের প্রয়োজনীয় পানি গ্রহন করবে। কিছুদিনের মধ্যে তারা বিরক্ত হয়ে পড়ে। কারন উষ্ট্রীটি প্রচুর পানি পান করত এবং পশুখাদ্যে ভাগ বসাতো। তারা উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলার জন্য আলাপ আলোচনা শুরু করে।

উষ্ট্রী হত্যা ও সামুদ জাতির ধ্বংস


উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলাকে অনেকেই বিপদজনক কাজ বলে সাবধান করলেও কিছু মানুষ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। একদিন সুযোগ বুঝে তারা এই অলৌকিক উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে এবং তার বাচ্চাটিকেও মেরে ফেলে। এই সংবাদ শুনে সালেহ আ. বলেন, তাদের জন্য আল্লাহর কঠিন শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে। তিন দিনের মধ্যে কঠিন শাস্তি নেমে আসবে।

সামুদ জাতি নবী সালেহ আ. এর সাবধান বাণী অবিশ্বাস করে এবং এটা নিয়ে উপহাস করে। সালেহ আ.কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে কিন্তু আল্লাহ সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। সামুদ জাতির উপর শাস্তির লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। প্রথম দিনে তাদের চেহারা উজ্জল হয়ে যায়, দ্বিতীয় দিনে লালচে হয়ে ওঠে, আর তৃতীয় দিনে তাদের মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়। প্রচণ্ড গর্জনের সাথে ভূমিকম্পে তারা মারা যায়।

কোরআনের বর্ণনায় সামুদ জাতির অবাধ্যতা ও শাস্তি


কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে সামুদ জাতির বর্ণনা করা হয়েছে। সুরা আরাফে আল্লাহ বলেন, সামুদ জাতির কাছে আমি সালেহ আ. কে পাঠিয়েছি। সে বলল, হে আমার জাতি তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তোমাদের পালন কর্তার পক্ষ থেকে প্রমান এসে গেছে। এটি আল্লাহর উষ্ট্রী, তোমাদের জন্য নিদর্শন স্বরূপ। তোমরা একে আল্লাহর জমিনে চরে বেড়াতে ছেড়ে দাও।

তোমরা একে অন্যায়ভাবে স্পর্শ করবে না, তাতে মর্মান্তিক শাস্তি তোমাদের পাকড়াও করবে। আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না। সামুদ জাতির দাম্ভিক নেতৃবৃন্দ দুর্বল মুমিনদের বললো, সালেহ কি তার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত? তারা বললো নিশ্চয় সে যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছে তাতে আমরা বিশ্বাসী। জবাবে দাম্ভিক নেতারা বললো, নিশ্চয় তোমরা যে বিষয়ে ঈমান এনেছ আমরা ওই বিষয়গুলো অস্বীকার করি।

তারপর তারা উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলল এবং রবের স্পষ্ট বিরোধিতা করে চলল, আর বলল, হে সালেহ ! তুমি যদি রসূল হয়েই থাক তাহলে তা নিয়ে এসো যার ভয় দেখাচ্ছ। ফলে তাদেরকে ভূমিকম্প পাকড়াও করলো। এক সকালে তারা তাদের ঘরে উপুড় হয়ে মরে পড়ে রইল। আর সালেহ আ. তাদেরকে পরিত্যাগ করে বললো, তোমরা সদুপদেশ পছন্দ কর না।

আল্লাহ সামুদ জাতিকে অফুরন্ত নেয়ামত দান করেছিল। তারা পাহাড় কেটে আলিশান প্রাসাদ নির্মান করত। তাদের ঝরনা, ক্ষেত খামার, বাগ বাগিচা ছিল। কিন্তু আজ শুধু পড়ে আছে বিরান মরুভূমি। তাদের বর্তমান অবস্থা জানার জন্য কোরআনের এই আয়াতটিই যথেষ্ট- ‘এই তো তাদের ঘরবাড়ি তাদের অন্যায়ের কারনে বিরান পড়ে আছে। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন আছে’। সুরা নামল: ৫২।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url