সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ইতিহাসের এক মহানায়ক
আবু নাসির সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব বা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ইতিহাসের এক মহানায়ক। মুসলিমদের ঘোর অমানিশার কালে তার আবির্ভাব হয়। তিনি ছিলেন মিশর ও সিরিয়ার প্রথম সুলতান এবং আইয়ুবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পাশ্চাত্যে তিনি সালাদিন বলে পরিচিত।
সালাহউদ্দিন আইযুবী নামক বীর যোদ্ধার আগমন
প্রায় দুইশত বছর ধরে খৃস্টান ক্রুসেডারদের আক্রমণের ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে ইসলামের রাজনৈতিক শক্তি একেবারে নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয় তখন সৃষ্টিকর্তার আশির্বাদ স্বরূপ সালাহউদ্দিন আইযুবী নামক বীর যোদ্ধার আগমন ঘটে। তিনি অসাধারণ দক্ষতা এবং সাহসীকতা দিয়ে মুসলমানদের শক্তি পুনপ্রতিষ্ঠিত করেন মুসলমানরা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তি পুনরায় ফিরে পায়।
ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তিনি মুসলিম প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন। তার সালতানাতে মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, হেজাজ, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সালাহউদ্দিন যোদ্ধা ও শাসক হওয়ার পাশাপাশি মুসলিম পণ্ডিত হিসাবে পরিচিত। তিনি ছিলেন মুসলিম, আরব, তুর্কি ও কুর্দি সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি অধিকাংশ সম্পদ দান করে যান।
কিংবদন্তী বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবী শুধু মুসলিম ইতিহাসে নয়, শুত্রুর কাছেও তিনি ছিলেন সম্মানিত এক বীর। সালাহউদ্দিন মেসাপটেমিয়ার তিকরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার কুর্দি বংশোদ্ভূত এবং মধ্যযুগীয় আর্মেনিয়ার ডিভিন শহর থেকে আগত। টাইগ্রিস নদীর উল্টো পাশে তিকরিত দুর্গের রক্ষক ছিলেন সালাহউদ্দিনের পিতা নাজিমুদ্দিন আইয়ুব।
যুদ্ধে পলাতক মসুলের শাসক ইমাদুদ্দিন জেনকিকে আশ্রয় দেয়ার অপরাধে ১১৩৭ সালে অর্থাৎ সালাহউদ্দিনের জন্মের বছর আইয়ুব পরিবারকে তিকরিত থেকে বহিস্কার করে। তিকরিত ছেড়ে চলে যাওয়ার রাতেই নাজিমুদ্দিনের স্ত্রীর কোল আলোকিত করে ইউসুফ নামের এক ফুটফুটে সন্তান দুনিয়াতে আসে। এই ছোট্ট ইউসুফই বড় হয়ে পরিনত হন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী নামে।
উদ্দেশ্যহীন ভাবেই রওনা দেয়ার সময় উপকারের প্রতিদান স্বরূপ ইমাদুদ্দিন জেনকি তার পরিবারকে মসুলে জায়গা করে দেয়ার একটি বার্তা পাঠায় এবং তাকে বারবেক দুর্গের কমান্ডার বানিয়ে দিলেন। এর মাত্র নয় বছর পরেই ইমাদুদ্দিন জেনকির মৃত্যুর পর ১১৪৬ সালে তার ছেলে নুরউদ্দিন জেনকি সিংহাসনে বসেন। ততদিনে সালাহউদ্দিন দামেস্কে বসবাস করতে শুরু করেন।
তার ছোটবেলার কথা খুব একটা জানা যায় না। ছোটকালেই ইউক্লিড জ্যামিতি, গণিত থেকে শুরু করে আইনও শিখে নেন। কুরআন শিক্ষার সাথে সাথে ধর্মতত্ত্বও সেরে ফেলেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার চাইতে ধর্মীয় বিষয়ে লেখাপড়ার ইচ্ছা বেশি ছিল। ধর্মীয় বিষয়ে আগ্রহের কারন হল খৃস্টানদের কর্তৃক জেরুজালেম অধিকার। ধর্ম ছাড়াও ইতিহাস, আরবি ও কুর্দি ভাষায় পণ্ডিত হয়ে যান।
সালাহউদ্দিনের চাচা আসাাদ আল দীন শেরকাহ নুরউদ্দিন জেনকির অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন কমান্ডার ছিলেন। তিনি সবসময় ভাতিজাকে তার সাথে রাখতেন। তিনি চাইতেন সালাহউদ্দিন যেন বড় হয়ে একজন শাসক হন। তার লেখাপড়া করার ইচ্ছাই ছিল বেশি। কিন্তু নাছোড়বান্দা চাচা সালাহউদ্দিনের সামরিক ক্যারিয়ার শুরু করিয়ে দেন। তার প্রথম সামরিক অভিযান ছিল ২৬ বছর বয়সে।
ক্রুসেডারদের আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন ফাতেমীয় সরকারের উচ্চপদে পৌঁছান। ফাতেমীয় খলিফা আল আদিদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। ১১৬৯ সালে তার চাচা শেরকাহ মৃত্যুবরণ করলে আল আদিদ সালাহউদ্দিনকে তার উজির নিয়োগ দেন। আল আদিদের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ফাতেমীয়পন্থি বিদ্রোহ উৎখাত করেন।
গভর্নর ও সেনা প্রধান হয়ে মিশর আগমন
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ছিলেন এমন একজন সুলতান যিনি ইসলামি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি বায়তুল মুকাদ্দাস ক্রুসেডারদের দখলের ৯০ বছর পর পুনরায় তাদের হাত থেকে মুক্ত করেন। এবং সেখানকার মুসলিমদেরকে অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করেন। ১১৬৯ সালে গভর্নর ও সেনাপ্রধান হয়ে মিশর আগমন করেন।
তার আগে থেকেই ইউরোপ, ফ্রান্স ও জার্মানি ইসলামিক রাষ্ট্র ভাঙ্গার জন্য ক্রুশ ছুঁয়ে শপথ করে, ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু করে নানা চক্রান্ত। সেই সঙ্গে চালায় সশস্ত্র অভিযান। মুসলিমদের থেকে ছিনিয়ে নেয় ইসলামের মহান চিহ্ন প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী মিশরের গভর্নর হওয়ার পরই সর্বপ্রথম সেখান থেকে খৃস্টানদের চক্রান্তে জড়িয়ে পড়া আমির উজিরদের সুকৌশলে সরকারী দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। এজন্য তাকে মারার অনেক ফন্দি আটার পরও ব্যর্থ হয়। দালালরা সুন্দরী মেয়ে ব্যবহার করেও পাথরের মত সালাহউদ্দিনকে টলাতে পারেনি। যেখানে অন্যান্য আমিররা সানন্দেই মেয়েদের গ্রহন করত।
সালাহউদ্দিনকে গলাতে না পেরে তাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য সেনাবাহীর মধ্যে সুদানি ও মিশরি বলে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে। সুদানের বর্ডার মিশরের কাছে থাকায় বিদ্রোহের পর সেখান থেকে আক্রমণ করাও সহজ ছিল। কিন্তু সালাহউদ্দিন চৌকস গোয়েন্দা দিয়ে আগেই তথ্য পেয়ে যায়। ফলে খুব সহজেই কৌশলে তাদের বিদ্রোহ দমন করেন।
সেনা বিদ্রোহ করে দালালরা সম্রাট ফ্রাঙ্ককে আক্রমণ করার আহ্বানও জানায়। কিন্তু সালহউদ্দিন আগেই বিদ্রোহ দমন করায় ফ্রাঙ্ক এর সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। এই দিকে ফ্রাঙ্ক মিশরে আক্রমণ করলে সিরিয়া থেকে নুরউদ্দিন জেনকিও ফ্রাঙ্ক এর দেশে আক্রমণ করে বসেন। ফ্রাঙ্ক দেশে ফিরে দেখে সব দিক দিয়েই তার শোচনীয় পরাজয় ঘটে গেছে।
বাগদাদের খলিফা ক্রুসেডারদের চক্রান্তে পড়লে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তাকে সুকৌশলে সরিয়ে বাগদাদকে সিরিয়ার খিলাফতের অধীনে এনে আরো একটি নতুন রাষ্ট্রে পরিণত করেন। ক্রুসেডাররা মূলত ফাতেমি খলীফাকে মদ আর নারী দিয়ে অধমে পরিণত করে, এমনকি সে সালাহউদ্দিনকে হত্যা করার পরিকল্পনাও করে। সালাহউদ্দিন খুৎবা থেকে খলীফার নাম উচ্চারণ করা বাদ দিয়ে দেন।
ক্রুসেডাররা সবসময় গোয়েন্দাদের ব্যবহার করে মিশরে কোন না কোন সমস্যা তৈরি করে রাখত। যাতে করে সালাহউদ্দিন নতুন করে আক্রমণের সময় না পান। তিনি যেন মিশর ঠিক করতেই সময় পার করে দেন। তারা মিশরের বিভিন্ন মসজিদে তাদের প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা ইমাম দিয়ে জিহাদের চেতনাকে ধ্বংস করতে চাইত। নারী দিয়ে মুসলিমদের চরিত্র ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ দিত।
সালাহউদ্দিন মিশরের স্থায়িত্ব আনার পরই বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করার জন্য বের হয়ে যান। তিনি সর্বপ্রথম ফিলিস্তিনের শোবক দুর্গ এবং পরে কার্ক দুর্গও জয় করেন। এই দুর্গ পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ক্রুসেডাররা পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, বেলজিয়াম, গ্রিস এবং পোপের অনুরোধে বৃটিশ যুদ্ধ জাহাজও যুক্ত হয় এই আক্রমণে।
এদিকে সালাহউদ্দিন গোয়েন্দা মারফত আক্রমণের খবর পেয়ে যান। তিনি এও জেনে যান যে, তারা আলেকজান্দ্রিয়া অঞ্চল দখল করবে। তাই তিনি সেখান থেকে জনগণকে সরিয়ে নিয়ে প্রতি ঘরে মুসলিম সৈন্য দিয়ে ভরে রাখেন। রাতে যখন নগরী দখলের জন্য প্রবেশ করে তখনই মুসলিম সৈন্যরা আক্রমণ করে নিষ্পেষিত করে দেয়। তাদের পালানোর জন্য জাহাজগুলিও ধ্বংস করে দেয়া হয়।
ক্রুসেডারদের আরেকটা অংশ ফিলিস্তিন থেকে আক্রমণের জন্য আসলে সুলতান নুরউদ্দিন জেনকি তাদের উপর আক্রমণ করে পরাজিত করেন। যুদ্ধ শেষে তিনি সালাহউদ্দিনকে তার অধিকৃত অঞ্চল দিয়ে সিরিয়ায় নিজ এলাকায় চলে যান। সালাহউদ্দিনের যুদ্ধ কৌশলের সবচেয়ে ভয়ানক কৌশল ছিল তার গেরিলা হামলা। শত্রুদের পিছনে আক্রমণ করে নিমিষেই হারিয়ে যেত।
গভর্নর থেকে সুলতান উপাধি লাভ
১১৭৪ সালে নুরউদ্দিন জেনকির মৃত্যু হয়। সালাহউদ্দিন হারান তার প্রিয় চাচাকে। নেমে আসে শোকের ছায়া। ক্রুসেডাররা খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে। জেনকির মৃত্যুর পর তার ১১ বছরের নাবালক পুত্রকে খলীফা হিসাবে মসনদে বসানো জেনকির স্ত্রী মেনে নিতে পারেনি। কারন নাবালক ছেলেকে ভুল বুঝিয়ে সব করিয়ে নিতে পারে। তিনি সালাহউদ্দিনকে চিঠি লেখেন তিনি যেন সিরিয়া দখল করেন।
একদিন সালাহউদ্দিন মাত্র ৭০০ সৈন্য নিয়েই সিরিয়ার মুল দুর্গ অবরোধ করেন। সিরিয়ার জনগণ খুশিতে নগরীর মুল ফটক খুলে দিলে তারা ভিতরে প্রবেশ করে সকলকে স্বাগত জানায়। খবর পেয়ে সকল আমলা-উজিররা দামেস্ক ছেড়ে পালিয়ে যায়। সালাহউদ্দিন সিরিয়া ও মিশরকে এক করে দেন। তখন থেকেই তাকে মিশরের গভর্নর থেকে সুলতান উপাধিতে ডাকা হয়।
পালিয়ে যাওয়া আমলা-উজিররা ক্রুসেডারদের সাথে আতাত করে পুনরায় সিরিয়া দখলের ফন্দি আটে। তারা সেখানকার মুসলিমদের বিভ্রান্ত করতে থাকে। তাদের বুঝাতে থাকে সালাহউদ্দিন অত্যাচারী ও নির্দয় শাসক। ক্রুসেডাররা সেই আমিরদের প্রচুর ধন-সম্পদ ও সুন্দরী মেয়ে দিয়ে এবং ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে বুঝাতো যে আমরাই ইসলামের সঠিক পথে আছি।
অতঃপর সালাহউদ্দিন হালব, মাসুল ও হাররান দুর্গ দখল করে নেন। সেখানকার মুসলিমরা গাদ্দার উজিরদের বিরুদ্ধে সালাহউদ্দিনের জন্য দরজা খুলে দিলে তারা আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। দুর্গ জয়ের পর সালাহউদ্দিনের সামনে বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে আর কোন বাধা রইল না। এইবার বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে আগমনের পালা।
সালাহউদ্দিন এবার কার্ক আক্রমণ করলেন। কার্কের শাসনভার ছিল অরনাতের উপর। তিনি রাসূল সা. কে নিয়ে বিদ্রুপ করত, হজ্জ কাফেলার উপর হামলা করে সম্পদ লুট করত এবং মেয়েদের তুলে নিত। ক্রুসেডাররা বর্ম পরে যুদ্ধে আসত আর তিনি যুদ্ধের সময় ঠিক করলেন জুন-জুলাই মাসে। এতে তারা বর্মের ভিতর উত্তাপে জ্বলে-পুড়ে মরতে লাগলো এবং তাদের পরাজয় হল।
বায়তুল মুকাদ্দাস দখল
ক্রুসেডারদের দ্বারা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল হয় ১০৯৯ সালে অর্থাৎ ৪৯২ হিজরীতে। মুসলিম আমিরগণই সে সময় তাদের নিরাপদে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে দেয়। সে সময় বায়তুল মুকাদ্দাসের গভর্নর ছিলেন ইফতেখারুদ্দৌলাহ, তিনি প্রাণপন লড়াই করে ব্যর্থ হয়। ক্রুসেডাররা নগরীতে প্রবেশ করে সব মুসলিমদের হত্যা করে।
মুসলিমরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মসজিদুল আকসা ও অন্যন্য মসজিদে আশ্রয় নিলে ক্রুসেডাররা মসজিদে ঢুকে প্রায় ৭০ হাজার মুসলিমদের হত্যা করে। রক্তে মসজিদ গড়িয়ে বাইরে প্রবাহিত হচ্ছিল এবং তাদের ঘোড়ার পা সেই রক্তে ডুবে যাচ্ছিল। শিশুদের মাথা কেটে ফুটলবল খেলত তারা। সালাহউদ্দিন ১১৮৭ সালে দ্রুত পৌঁছে বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন।
এদিকে খৃস্টানরা তাদের পবিত্র ভুমি ছাড়তে নারাজ। তারাও আমরণ যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। সেখানকার প্রায় সকল মুসলিমরা জেলে বন্দী। জেল থেকেই মুসলিমরা আজান আর তাকবীর ধ্বনি দিচ্ছে। খৃস্টানরাও গির্জায় প্রার্থনা করছে ও গান গাইছে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দুই পক্ষেরই আহত ও নিহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ৫৮৩ হিজরী অর্থাৎ ১১৮৭ সালে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় হয়।
ইসলামিক খেলাফতের শেষের দিকে মুসলিমরা যখন ক্রুসেডারদের দাসত্ব গ্রহন করল তখন তারা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্রকে টুকরা টুকরা করে দিল। ফিলিস্তিনে প্রবেশের মাধ্যমে মূলত তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করল। মুসলিমদের হত্যা ও ভূমি ছাড়া করল। কতিপয় মুসলিম শাসকদের সহায়তায় সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব করল।
অবশেষে ১১৯৩ সালে ইসলামের এই মহান নেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ইন্তিকাল করেন। সেদিন সমগ্র ফিলিস্তিনের নারী-পুরুষ রাস্তায় বের হয়ে মাতম করতে থাকে। নগরের অলিতে-গলিতে কান্নার রোল পড়ে যায়। আজও সেই কান্নার রোল শোনা যায়, তারা যেন তাদের সেই সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকেই খুঁজছে ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য।
ক্রুসেডাররা ইসলামের সর্বশেষ খিলাফত তুরস্ক থেকেও খিলাফত ধ্বংস করল। লর্ড কার্জন বলেন, আমরা মুসলিমদের মেরুদণ্ড খিলাফতকে ধ্বংস করে দিয়েছি, তারা আর দাড়াতে পারবে না। সালাহউদ্দিনের কবরে লাথি মেরে বলল, উঠো সালাহউদ্দিন, তোমার বায়তুল মুকাদ্দাসকে রক্ষা কর। ইউরোপ জুড়ে সালাহউদ্দিনের এরকম নানা ঘটনা প্রচলিত আছে।
তিন হাজার আলেম হত্যা
আল-আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করার পর সবাই যখন আনন্দে মশগুল তখন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। এর কারন জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, বায়তুল মুকাদ্দাস জয় হয়েছে কিন্তু এখনও এমন শত্রু আমাদের মাঝে আছে যাদেরকে খুঁজে বের করতে না পারলে বায়তুল মুকাদ্দাস আমরা বেশি দিন আমাদের কাছে রাখতে পারবো না।
তার এই কথার তাৎপর্য কেউ অনুভব করতে পারল না। সালাহউদ্দিন তার খুব বিশ্বস্ত সেনাদের নিয়ে গোপনে একটি গোয়েন্দা বিভাগ গঠন করলেন। আটককৃত ইহুদি গোয়েন্দাদের থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ট্রেনিং দিলেন। সেনারা ফিলিস্তিনে এক ইমামের কাছে গেলেন, লোকজন যার প্রশংসায় ভরপুর, স্কলার, আমলদার ও পরহেজগার হিসাবে তার সুখ্যাতি ফিলিস্তিন জুড়ে।
একদিন তিনি মসজিদে কুরআনের আলোচনা করছিলেন। এ সময় দুই জন আগন্তক এসে মনোযোগ দিয়ে আলোচনা শুনছিল। আলোচনা শেষে ইমামের সামনে গিয়ে প্রশ্ন করলো, সূর্য কখন ওঠে? ইমাম জবাব দিল, যখন বৃষ্টি থেমে যায়। আরেকজন প্রশ্ন করলো, বৃষ্টি কোন দিক থেকে আসে? ইমাম উত্তর দিল, ঝড়ো হাওয়ার দিক থেকে। এভাবে আরো কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর নিল।
উপস্থিত লোকজন কিছুই বুঝলো না। লোকজন চলে যাওয়ার পর ইমাম আগন্তকদের নিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করলেন। ঘরে যেয়ে ইমাম তাদের সাথে তার নিজের পরিচয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। ইমামের স্ত্রী তাদের জন্য মদ পরিবেশন করলেন। আগন্তকরা ইমামের সাথে বিস্তারিত কথা বলা শুরু করলো। ইমাম কবে থেকে মানুষের মধ্যে ফিৎনা ছড়িয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে কথা হতে লাগলো।
ইমামও খুব আগ্রহের সাথে কিভাবে মানুষের মাঝে ফিৎনা ছড়াচ্ছে, কিভাবে মানুষকে জিহাদ থেকে বিমুখ রাখছে, কিভাবে ইহুদিদের ক্ষমতার ভয় মুসলিমদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে ইত্যাদি সব বলতে লাগলো। প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার পর আগন্তকরা তাদের পাগড়ি ও উপরের পোষাক খুললে ইমাম ভয়ে পালাতে থাকে। কারন তারা ছিল সালাহউদ্দিনের গোয়েন্দা।
গোয়েন্দারা ইমামকে ধরে নিয়ে গেল এবং তাকে হত্যা করল। এভাবে সালাহউদ্দিন তিন হাজার ইহুদি আলেম হত্যা করেছিল। যারা মূলত ইহুদি কিন্তু ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানুষের মাঝে ফিৎনা ছড়ানোই ছিল তাদের মূল কাজ। সুলতানের এই কঠোর পদক্ষেপ অনেকের কাছে বিতর্কিত মনে হলেও মুসলিম সমাজকে বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
ইসলামের ইতিহাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এমন এক নাম যিনি নিজের বুদ্ধিমত্তা, সাহসিকতা এবং ধর্মের প্রতি নিবেদিত মনোভাবের জন্য আজও স্মরণীয়। তার বিচক্ষণতা ও প্রখর নেতৃত্বের কারনে মুসলিম বিশ্ব এক ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে যায়। তিনি শুধু ক্রুসেডারদের মনোবৃত্তিকেই ধ্বংস করেননি বরং ইসলামকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে এর গৌরব ফিরিয়ে আনেন।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url