তাবুক অভিযান নবব শতাব্দীর একটি স্মরণীয় ঘটনা
তাবুক অভিযানে নবী মুহাম্মদ সা. ৯ম হিজরি অর্থাৎ ৬৩০ খৃস্টাব্দে নেতৃত্ব দেন। এই অভিযানে প্রায় ৩০,০০০ যোদ্ধা অংশগ্রহণ করে। তাঁর বাহিনী নিয়ে উত্তরদিকে তাবুকের দিকে রওনা দেন। এটি ছিল রাসূল সা. এর সর্ববৃহৎ এবং শেষ সামরিক অভিযান।
তাবুক অভিযান নবব শতাব্দীর একটি স্মরণীয় ঘটনা
রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানকে ‘গাজওয়াতুল উসরাহ’ বা কষ্টের অভিযান বলা হয়। কারন গ্রীষ্মের প্রখর রোদ ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে তাবুক পর্যন্ত অগ্রসর হতে হয়েছিল। সরাসরি কোনো যুদ্ধ না হলেও মুসলিম বাহিনী রোমানদের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত ছিল এবং এটি ছিল ইসলামি শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি, রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্য। মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান শক্তির কারনে রোমানরা তাদের সীমান্ত অঞ্চলের ওপর ইসলামি প্রভাব নিয়ে চিন্তিত ছিল। কাফের ও মুনাফিকরা রোমানদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করছিল। রোমানদের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে স্বয়ং রাসূল সা. নেতৃত্ব দেন।
বাইজেনটাইনদের সম্ভাব্য আগ্রাসনের গুজব ছড়িয়ে পড়লে মুহাম্মদ সা. তাঁর অনুসারী ও মিত্রদের দ্রুত অভিযানে যোগ দেয়ার জন্য আহ্বান জানান। মদিনা থেকে প্রায় ৬৯০ কিলোমিটার দুরে তাবুক প্রান্তরে যেতে অনেকে প্রাথমিক অনিচ্ছা ও নানা অজুহাত দেন। তখন নবী মুহাম্মদ তাদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উপহার ও প্রণোদনা প্রদান করেন।
মুসলমানদের তাবুক অভিযান নবব শতাব্দীর একটি স্মরণীয় ঘটনা। রোম সম্রাটরা বহু আগে থেকেই আরব দেশ জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন। সম্রাট হেরাক্লিয়াসের কাছে ইসলামের বাণী সহ দূত পাঠালে তিনি দূতকে পরম সমাদরে গ্রহন করলেও আরব দেশ জয়ের আশা ছাড়েননি। মুতার যুদ্ধে খৃস্টানদের পরাজয় তার ঈর্ষাবহ্নি শতগুণ বৃদ্ধি পায়। প্রায় লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে মদিনা আক্রমণে অগ্রসর হলেন।
রোম সম্রাটের এ আক্রমণের যে সব কারন ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, তা হল, মুসলিম বিদ্বেষী লোকেরা রোম সম্রাটকে জানায় যে, মুহাম্মদ সা. আর ইহজগতে নাই। আরবে তখন অজন্মা, দুর্ভিক্ষ ও বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান। সুতরাং এ সুযোগে উদীয়মান মুসলিম শক্তিকে খুব সহেজে পরাস্ত করা সম্ভব বলে রোম সম্রাট মনে করেছিলেন। সে জন্য তিনি আরবদেশ অধিকারের সিদ্ধান্ত নেন।
হেরাক্লিয়াসের অভিযানের কথা শুনে মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে মুসলমানরা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। বিভিন্ন গোত্র ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। প্রায় ১০ হাজার অশ্বারোহীসহ মোট ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে নবী করিম সা. রোম সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সদলবলে তাবুক অভিমুখে রওনা হলেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতি
তাবুক যুদ্ধের ঘোষণা ছিল এক অসাধারণ চ্যালেঞ্জ। কারন এটি ছিল ইসলামের একটি বিশাল সামরিক প্রচারণা। এটি এমন সময়ে সংঘটিত হয়েছিল যখন আরব অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড তাপ এবং ফসল কাটার মৌসুম ছিল। মুসলিমদের তখন অর্থনৈতিক কষ্ট ছিল এবং খাদ্য ও পানির সংকট প্রকট ছিল। রাসূল সা. যুদ্ধের আহ্বান জানালে সাহাবিরা সাধ্যমত অর্থ ও সম্পদ দান করেন।
এতে করে এই কঠিন সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান নিশ্চিত হয়। মোট ৩০ হাজার সৈন্য প্রস্তুত করা হয় তাবুক অভিযানের জন্য। এই বিশাল বাহিনীকে সমর্থন দেয়ার জন্য মুসলিম সমাজের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ উৎসাহিত হয়। রাসূল সা. এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে যায়। বাইজেনটাইন সৈন্যরা যুদ্ধ না করে ভয়ে পিছু হটে।
তাবুক যুদ্ধে বড় কোন সংঘর্ষ না হলেও এটি ছিল কৌশলগত বিজয়ের একটি নিদর্শন। তাবুকে অবস্থান করার সময় রাসূলুল্লাহ সা. আশেপাশের উপজাতিদের সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেন। খৃস্টান ও ইহুদি গোত্রের নেতারা মুসলিমদের সাথে সন্ধি চুক্তি করেন এবং জিজিয়া কর দিতে সম্মত হন। এটি মুসলিমদের সাম্রাজ্য বিস্তারে ভূমিকা পালন করে।
এ যুদ্ধ ইসলামের সামরিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। রাসূল সা. মদিনায় ফিরে এসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজ সম্পন্ন করেন। বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যকে মোকাবেলা করে মুসলিমরা প্রমাণ করেছে যে তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। মহানবী সা. এর নেতৃত্ব শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ করে।
তাবুকের যুদ্ধের আগে একবার মুতার যুদ্ধেও মুসলিমদেরকে রোমানদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু এবার রাসূল সা. নিজেই অগ্রসর হয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। রাসূল সা. এ যুদ্ধে আবু বকর রা. এর হাতে যুদ্ধের পতাকা তুলে দেন। এ যুদ্ধের সফর ছিলো খুবই লম্বা ও কষ্টকর। পানির অভাবে উট জবাই করে এর পাকস্থলিতে থাকা পানি পান করতে হয়েছিল।
তাবুক যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করার ঘটনাও খুব মর্মস্পর্শী। ওমর রা. সম্পদের অর্ধেক রাসূল সা. এর কাছে জমা দিলেন। তারপর আবু বকর এসে কিছু সম্পদ জমা দিলেন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? আবু বকর রা. বললেন, আমি আমার আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। এ যুদ্ধে ওমর রা. আবু বকরের সমান হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন।
পথিমধ্যে কতিপয় অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন
এক. নবীর ইশারায় বৃষ্টি বর্ষণ : আবু বকর রা. নবী করিম সা. এর নিকট যেয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনি আমাদের পানির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। নবী করিম আকাশের দিকে দুই হাত তুলে দোয়া করলেন। হাত নামানোর পূর্বেই বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। সাহাবারা নিজ নিজ পাত্র পূর্ণ করে নিলেন এবং বর্ষণ ও বন্ধ হয়ে গেল।
দুই. হারানো উটের সন্ধান দান : তাবুকের পথে এক স্থানে বিশ্রামকালে নবী সা. এর উটটি হারিয়ে যায়। রাসূল সা. বললেন, শোন আমি নিজে কোন গায়েবী সংবাদ জানিনা বটে কিন্তু আল্লাহ আমাকে যেসব গায়েবী খবর জানান তা অবশ্যই জানি। যাও তোমরা গিয়ে দেখো- আমার উটটি ময়দানের একটি গাছের সাথে রশি আটকিয়ে আছে। সাহাবায়ে কেরাম উক্ত স্থানে গিয়ে নিয়ে আসলেন।
তিন. কুপে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত : সাহাবিরা তাবুকের একটি প্রায় শুষ্ক কুপের নিকট পৌছে অল্ল অল্প করে পানি তুলে একটি পাত্রে রাখলেন। নবী করিম সা. ঐ পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে অবশিষ্ট পানি কুপের মধ্যে ঢেলে দিলেন। অমনি কুপে পানি প্রবাহিত হতে লাগলো।
চার. তীব্র বায়ু প্রবাহের আগাম সংবাদ : নবী করিম সা. বললেন, আজ রাতে তোমাদের উপর দিয়ে প্রবল ঝড়ো বায়ু প্রবাহিত হবে। কেউ তাঁবু থেকে একা বের হবে না। তাঁর নির্দেশ মোতাবেক সবাই তাবুতে অবস্থান করলেন। কিন্তু দুই ব্যক্তি তাঁবু থেকে বের হলেন- একজন প্রকৃতির ডাকে আরেক জন উটের সন্ধানে বের হলেন। এমন সময় হটাৎ করে বায়ু প্রবাহ শুরু হলো।
দুজনের মধ্যে একজন বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন এবং আরেক জনকে উড়িয়ে নিয়ে তাঈ নামক পাহাড়ে নিক্ষেপ করলো। নবী করিম সা. কে এ সংবাদ দেয়া হলে তিনি দোয়া করলে বেহুশ ব্যক্তি জ্ঞান ফিরে পায়। রাসূল সা. মদিনায় প্রত্যাবর্তন করার পর তাঁর সম্মানে তাঈ পাহাড় উক্ত ব্যক্তিকে মদিনায় পৌছে দেয়।
পাঁচ. ২১ টি খেজুর দিয়ে সকল সৈন্যকে খাওয়ানো : সাহাবারা খাদ্যাভাবের কথা নবী করিম সা. কে জানালে তিনি আবু হুরায়রাকে ডেকে বললেন, দেখো কারো কাছে সামান্য খাদ্যবস্তু আছে কিনা? আবু হুরায়রা খোঁজ করে ২১ টি খেজুর রাসূলের নিকট আনলেন। প্রিয় নবী সা. খেজুরের উপর হাত রেখে দোয়া করলেন এবং সবাইকে তিনি প্রয়োজন মাফিক খেজুর সরবরাহ করলেন।
নবী করিম সা. আবু হুরায়রাকে খেজুরের থলেটি দিয়ে বললেন, যখনই প্রয়োজন মনে করবে তখনই খেজুর বের করে আনবে, কিন্তু মুখ খুলবেনা। আবু হুরায়রা বললেন, রাসূলের বাকি জীবন, আবু বকর ও ওমর এবং ওসমান রা. এর খেলাফতের যুগ মিলে মোট ছাব্বিশ বছর উক্ত থলে থেকে খেজুর কেয়েছি এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করেছি। পরে থলেটি লুট হয়ে যায়।
ছয়. একই সময় তাবুক ও মদিনায় উপস্থিতি : আনাছ ইবনে মালেক বলেন- আমরা এবং নবী করিম সা. তখন তাবুকে অবস্থান করছিলাম। এ সময়ে মদিনাবাসী এক সাহাবী ইন্তেকাল করেন। জিবরাঈল আ. এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনি ইচ্ছে করলে জমিনকে সংকুচিত করে দেবো যাতে করে আপনি তার জানাযা পড়াতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, তাই কর। তিনি জানাযা পড়ায়ে আবার ফিরে আসেন।
রক্তপাতহীন এ যুদ্ধে মহানবী সা. বিশাল সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে বিশ্বনেতা হিসাবে তার অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। এ বিজয়ে মুসলমানরা বিশ্ব নেতৃত্ব লাভের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়। এ ছাড়াও মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের পাশাপাশি বহিঃবিশ্বে ইসলাম প্রচারের পথ সুগম হয়। এ যুদ্ধে সাহাবারা ত্যাগের যে নজরানা পেশ করেছেন তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url