নূহ আ. কে আদমে সানি বা দ্বিতীয় আদম বলা হয়

নূহ আ. এর মহাপ্লাবন বলতে বোঝায় একটি ভয়াবহ বন্যা। আল্লাহ এই বন্যাতে তাঁর অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করেছিলেন এবং শুধুমাত্র নূহ আ. এর অনুসারীদের নৌকাতে উঠিয়ে রক্ষা করেছিলেন। এই প্রাচীন ঘটনাটি কোরআন ও বাইবেলে ইল্লেখ আছে।

নূহ আ. কে আদমে সানি বা দ্বিতীয় আদম বলা হয়

আল্লাহ নূহ আ. কে ৯৫০ বছরের সুদীর্ঘ জীবন দান করেন


নূহ আ. কে আদমে সানি বা দ্বিতীয় আদম বলা হয়। তিনি যখন তাঁর উম্মতকে এক আল্লাহর দিকে ডাকতেন, তখন তারা অসম্মান ও অপমান করত এবং কানে হাত দিয়ে রাখত। তারা সত্য ধর্ম থেকে বিমুখ ছিল এবং কুফরিতে লিপ্ত ছিল। এক সময় নূহ আ. উম্মতের উপর চরম বিরক্ত হলেন এবং আল্লাহর কাছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন।

আল্লাহ নূহ আ. কে সাড়ে নয়শত বছরের সুদীর্ঘ জীবন দান করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী অক্লান্তভাবে দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও তার কওম ঈমান আনেনি। তারা জনবল ও অর্থবলে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আল্লাহ নীতি এই যে, তিনি অবাধ্য জাতিকে সাময়িকভাবে অবকাশ দেন। তারা নূহ আ. এর দাওয়াতকে তাচ্ছিল্য ভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। নূহ আ. তাদেরকে দিবারাত্রি দাওয়াত দিতেন।

হজরত আদম আ. এর প্রায় এক হাজার বছর পর আল্লাহ নূহ আ. কে প্রেরণ করেন। ইরাক ও ফুরাত নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে তিনি অবতীর্ণ হন। তাঁর প্রকৃত নাম আব্দুল গফফার বিন মালিক। কিন্তু কোরআনে নূহ নামেই অভিহিত। নূহ কথার অর্থ ক্রন্দন। তাঁর সময়ে মহাপ্লাবনে স্ত্রী, পুত্র সহ অনেক আত্মীয় মারা যায়। তিনি এতই কেঁদেছিলেন যে আল্লাহ তাঁকে নূহ নামেই অভিহিত করেন।

চল্লিশ বছর বয়সে রমজান মাসে তিনি নবুয়ত লাভ করেন। ইসলামের দাওয়াত দেন প্রায় ৯৫০ বছর। কিন্তু নবী হিসাবে কেউ মানতে রাজি নয়। তারা বলতে লাগল, তুমি তো আমাদের মতই মানুষ। তবে কেমন করে নবী হলে? নূহ আ. বললেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। আমি তোমাদের কাছে কিছুই চাইনা শুধু তোমাদের মুক্তির জন্য সতর্ক করছি।

নূহ আ. এর নাম কুরআনে ৪২ বার উল্লেখ করে আল্লাহ তাঁর অবাধ্য সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার বিষয়টি বিভিন্ন আয়াতে বর্ণনা করেছেন। নূহ আ. এর সম্প্রদায় আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখেনি এবং তাঁর আদেশের অবাধ্য হয়েছিল। যারা বিরোধিতা করেছিল তাদের উপর গজব নেমে এসেছিল। যখন বন্যা শুরু হয় তখন শুধুমাত্র নৌকায় থাকা অনুসারীরাই রক্ষা পায়।

নূহ আ. একজন নবী ছিলেন। কুরআনে নূহ শিরোনামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়েছে যেখানে তার এবং সমকালীন বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে। খৃস্ট ধর্মের বাইবেলেও তার সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি সাড়ে নয়শত বছরের দীর্ঘ বয়স লাভ করেছিলেন। সারা বছর মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য কাজ করেন। কিন্তু তার জাতি তাঁকে প্রত্যাখান করেন।

আদম আ. এর বংশধর নারী পুরুষরা এক আল্লাহর উপাসনা করত। এই ধার্মীক লোকেরা মারা যাওয়ার পর তাঁদের চিত্র ঝুলিয়ে রেখে তাঁদেরকে স্মরণ করার মাধ্যমে আল্লাহর উপাসনা করত। কিছুকাল পর চিত্রগুলির মূর্তি নির্মাণ করল। আরও কিছুকাল পর পরবর্তী বংশধররা এসব মূর্তির উপাসনা করতে শুরু করে। এসব লোকদের সঠিক পথ দেখাতে আল্লাহ নূহ আ. কে নবী হিসাবে পাঠান।

হজরত নূহ আ. প্রাচীন নবীদের একজন। তিনি মানবজাতিকে এক আল্লাহর আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তোমরা শুধু এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং আমার কথা মানো। আল্লাহ তোমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন। আল্লাহ নূহ আ. কে জানিয়ে দিলেন, তোমার জাতির যেসব লোক ইমান এনেছে, তারা ছাড়া অন্য কেউ আর ইমান আনবে না। এ নিয়ে তুমি কোনো দুঃখ করোনা।

আল্লাহর নির্দেশে বিশাল নৌকা তৈরি


নূহ আ. আল্লাহর আদেশে একটি বিরাট নৌকা বানাতে শুরু করেন। নৌকাটি লম্বায় ছিল ১২০০ হাত, আর প্রস্থ ছিল ৬০০ হাত। তাঁর স্বজাতির নেতারা নৌকা বানাতে দেখে তাঁকে ঠাট্টা-তামাশা করত। তিনি বলতেন, যখন আল্লাহর প্রতিশ্রুত আজাব আসবে তখন টের পাবে। অবশেষে আল্লাহর প্রতিশ্রুত আজাব শুরু হল। মাটি ফেটে পানি বের হতে লাগল। আকাশ থেকে নামল ভারী বর্ষণ।

আল্লাহ নূহ আ. কে বললেন, সব প্রাণীর নারী-পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় নৌকায় উঠিয়ে নিতে। নূহ আ. বিশ্বাসীদের ডেকে বললেন, আল্লাহর নাম নিয়ে তোমরা নৌকায় চড়ে বসো। নৌকা তাদের নিয়ে ভাসতে লাগল। নূহ আ. তাঁর ছেলেকে বললেন, আমাদের সঙ্গে নৌকায় এসে বসো, অবিশ্বাসীদের সঙ্গে থেকো না। ছেলে দম্ভভরে বলল, আমি কোনো পাহাড়ে উঠে পড়ব, তখন আমি মুক্তি পেয়ে যাব।

নূহ আ. বললেন, আল্লাহর আজাব থেকে তিনি ছাড়া আর কেউ বাঁচতে পারবে না। চতুর্দিক থেকে পানি আসতে শুরু করে। জমিন ফেটে পানি বের হতে লাগল। গাছপালা ঘরবাড়ি পানির তলায় ডুবে গেল। একমাত্র নূহ নবীর নৌকা ভাসমান। তাঁর তিন পুত্র- সাম, হাম, ইয়াফিস নৌকায় চড়লেও পুত্র কিনান দাম্ভিকতার কারনে নৌকায় চড়লোনা। শেষে তার ছেলে পানিতে ডুবে মরল।

অনেক দিন পর বর্ষণ বন্ধ হলো। নূহ আ. এর নৌকা জুদি পর্বতে গিয়ে ঠেকল। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আমার ছেলেও আমার পরিবারের সদস্য। আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে দিবেন, তাহলে আমার ছেলে কেন ডুবে মরল? আল্লাহ বললেন, তোমার ছেলে তোমার পরিবারভূক্ত নয়। যে ব্যাপারে তোমার জানা নাই, সে বিষয়ে আবেদন করো না।

নূহ আ. জানতেন না যে তাঁর ছেলে অবিশ্বাসী ছিল। তিনি আল্লাহর কাছে অনুশোচনা করে তওবা করলেন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন। কুরআনে তার নামে একটি সুরা আছে। সে সময়ের মানুষরা ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর নামে পাঁচটি মূর্তির পুজা করত। নূহ আ. কাউকে দাওয়াত দিলে তাদের নেতৃবৃন্দ বলত, তোমরা মূর্তিদের ত্যাগ করো না।

কওমের ৫ টি আপত্তি ও তার জবাব


প্রথম : তাঁর কওমের লোকজন বলল, এ লোক তো তোমাদের মতই মানুষ। আসলে সে তোমাদের উপর নেতৃত্ব চায়। আল্লাহ তো একজন ফেরেশতা পাঠাতে পারতেন। আসলে লোকটার মধ্যে পাগলামী আছে কিংবা কোন জিন আছে। জবাবে আল্লাহ বলেন, যদি কোনো ফেরেশতাকে রাসুল করে পাঠাতাম, তবে সে মানুষ আকারেই হতো। কিন্তু এতেও তারা ওই সন্দেহই প্রকাশ করতো।

দ্বিতীয় : আপনার অনুসারীরা সমাজের গরিব ও নিচু জাতের। সুতরাং আপনি তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। জবাবে নূহ আ. বলেন, আমি কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিতে পারি না। বরং আমি তোমাদেরকেই মুর্খ দেখছি। হে আমার কওম, আমি যদি ওসব লোকদের তাড়িয়ে দিই, তাহলে কে আমাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা করবে? তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করেবে না?

তৃতীয় : তারা বলেছিল, আপনি জাতির নেতৃস্থানীয় কেউ নন, সুতরাং কেন আমরা আপনার কথা মান্য করব? জবাবে নূহ আ. বলেন, ‘তোমাদের দৃষ্টিতে যারা দ্বীনহীন ও অবাঞ্ছিত তাদের আল্লাহ কোনো কল্যাণ দান করবেন না- এটা আমি বলবো না। তাদের মনের কথা আল্লাহ ভালো করেই জানেন। সুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাব’। (সুরা হুদ-৩১)

চতুর্থ : তারা বলেছিল, আপনার দাওয়াত আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রথাবিরোধী। সুতরাং আমরা তা মানব না। জবাবে নূহ আ. বলেন, হে আমার কওম, আমার মধ্যে কোনো পথভ্রষ্টতা নাই। বরং আমি বিশ্বপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসুল। আমি তোমাদের কাছে আমার প্রভুর বার্তা পৌঁছে দিই এবং সদুপদেশ দিয়ে থাকি। কেননা আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন বিষয় জানি যা তোমরা জানো না।

পঞ্চম : তারা বলেছিল, মূলত আপনি ক্ষমতা চাচ্ছেন। জবাবে নূহ আ. বলেন, এ দাওয়াতের বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোনো ধনদৌলত বা কোনো বিনিময় কামনা করি না। আমার পুরস্কার তো কেবল বিশ্বপালকের কাছেই রয়েছে।

নূহ আ. নারী ও পুরুষ ‍মিলিয়ে ৮০ জন মুমিন এবং পশু-পাখি নিয়ে নৌকায় চড়ে বসেন। নৌকায় ওঠার পরেই শুরু হয় বন্যা। সবচেয়ে উঁচু পাহাড়েরও ১৫ হাত উপরে পানি উঠে যায়। বিশাল এই নৌকাটি ১৫০ দিন ভেসে থাকার পর মুহররমের ১০ তারিখে জুদি পাহাড়ে নোঙর ফেলে। নূহ আ. সহচরবৃন্দ এবং পশুপাখি মিলে আবার পৃথিবীর বুকে বসবাস শুরু করে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url