তিতুমীর সহযোদ্ধাদের নিয়ে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন

বৃটিশ বেনিয়ার জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়ানো মহাবীর শহীদ সৈয়দ নেসার আলী তিতুমীর সহযোদ্ধাদের নিয়ে বাঁশের কেল্লায় সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি বাঙ্গালা আমিরাত নামক স্বল্পস্থায়ী রাষ্ট্রের বাদশাহ ছিলেন।ইসলামের অনুশাসনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

তিতুমীর সহযোদ্ধাদের নিয়ে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন

বিপ্লবী নেতা সাইয়িদ আহমদ ব্রেলভির সান্নিধ্য লাভ


তিতুমীর ১৭৮২ সালে চব্বিশ পরগনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারের সদস্যরা নিজেদের হযরত আলীর বংশধর বলে দাবি করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের স্কুলে। ১৮ বছর বয়সে কোরআনের হাফেজ হন এবং হাদিস বিষয়ে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। আরবি ও ফার্সি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।তিনি ১৮৮২ সালে হজ্জ পালনের জন্য মক্কা শরীফ যান।বিপ্লবী নেতা সাইয়িদ আহমদ ব্রেলভির সান্নিধ্য লাভ করেন।

সাইয়িদ আহমদ তাঁকে বাংলার মুসলমানদের অনৈসলামিক রীতিনীতির অনুশীলন এবং বিদেশি শক্তির পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৮২৭ সালে মক্কা থেকে দেশে ফিরে তিতুমীর চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলায় মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী অনুশাসন প্রচার শুরু করেন।তিনি শিরক ও বেদআত থেকে বিরত থেকে ইসলামের অনুশাসন মোতাবেক জীবনযাত্রা পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করেন।

তৎকালে বারাসত জেলা এবং নদীয়া জেলার কিছু অংশ নিয়ে ওয়াহাবি আন্দোলন তিতুমীরের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামিক সংস্কার বা অ -ইসলামিক আচার-অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত হওয়া। তিনি বৃটিশ শাসন ও তাদের অনুগত অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। যুদ্ধরত অবস্থায় ১৮৩১ সালে বাঁশের কেল্লায় তাঁর মৃত্যু হয়।

তিতুমীর তার গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার এবং বৃটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে ‘তাহবন্দ’ নামে এক ধরনের বস্ত্র পরিধান শুরু করেন। হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায় কর্তৃক মুসলমানদের উপর আরোপিত ‘দাড়ির খাজনা’ এবং মসজিদ তৈরিতে করের তীব্র বিরোধিতা করেন।

জমিদার কৃষ্ণদেব রায় মুসলমান প্রজাদের জন্য যে হুকুম জারী করেছিল


  • এক. দাড়ি রাখলে আড়াই টাকা এবং গোঁফ ছোট রাখলে পাঁচ সিকে করে খাজনা দিতে হবে।
  • দুই. মসজিদ তৈরি করলে কাঁচা মসজিদের জন্য ৫০০ টাকা এবং পাকা মসজিদের জন্য ১০০০ টাকা করে খাজনা দিতে হবে।
  • তিন. সন্তানদের আরবী নাম রাখলে প্রত্যেক নামের জন্য ৫০ টাকা খাজনা দিতে হবে।
  • চার. গোহত্যা করলে তার ডান হাত কেটে দেয়া হবে।
  • পাঁচ. যে তিতুমীরকে বাড়ীতে স্থান দিবে তাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হবে।

এসব বৈষম্যমূলক আচরনের জন্য তিতুমীর ও তার অনুসারীদের সাথে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হতে থাকে। আগেই তিনি পালোয়ান হিসাবে এবং জমিদারের লাঠিয়াল হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলেন। অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে যখন প্রায় ৫০০০ এ পৌছায় তখন সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়।

গোবরডাঙ্গার জমিদারের প্ররোচনায় মোল্লাহাটির ইংরেজ কুঠিয়াল ডেভিস তার বাহিনী নিয়ে তিতুমীরের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং যুদ্ধে পরাজিত হন। গোবরা গোবিন্দপুরের জমিদার নিহত হন। তিতুমীর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও ফরিদপুর জেলায় স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজ ও জমিদারদের সম্মিলিত বাহিনী তিতুমীরের নিকট পরাজয় বরণ করেন।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব


বৃটিশদের ১৭৯৩ সালে আরোপিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। হিন্দু জমিদাররা জমির স্থায়ী মালিকানা পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা সমাজ কাঠামোর মূলে কঠোর আঘাত হানে। মোঘল আমলের লাখেরাজ ভূমি অর্থাৎ খাজনা মওকুফ করা জমি জনহিতকর কাজে অনুদান দেয়া হত। বৃটিশরা এসব জমি বাজেয়াপ্ত করে জমিদারদের দিয়ে দেয়া হয়।

এ বাজেয়াপ্তকরণের ফলে মুসলমানরা সবচেয়ে বিশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। উইলিয়াম হান্টার তার লেখা ‘ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ বইতে লেখেন, এর ফলে শত শত মুসলমান পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা যা এতদিন লাখেরাজ জমির উপর নির্ভরশীল ছিল, সেটা মারাত্মক আঘাত পেল। মুসলমান আলেম সমাজ একবারে ধ্বংস হয়ে গেল।

জমিদাররা বৃটিশদের কাছে অল্প কিছু খাজনা দিয়ে প্রজাদের উপর অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য জবরদস্তি করত। কারন যত বেশি কর, তত বেশি বিলাসী জীবনযাপন। বৃটিশরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জানিয়ে দিত মুসলমানদের পরাজিত করা হয়েছে এবং হিন্দু রাজত্বের কথা নানা ভাবে প্রকাশ করত। এর অংশ হিসাবে মুসলমানদের ধর্মীয় আচার-আচরণের ওপর কর ধার্য করত।

বৃটিশদের বাণিজ্যিক শোষণও কম ছিল না। তারা তাদের একচেটিয়া বাণিজ্যের জন্য স্থানীয় কুটির শিল্প বিশেষ করে বস্ত্র শিল্প ধ্বংস করেছিল। যে বস্ত্র শিল্প ছিল বিশ্বের সেরা, সেটা একবারেই শেষ হয়ে যায়। ফলে কৃষির উপর চাপ বাড়ে এবং দারিদ্র প্রকট হয়। এর সঙ্গে ছিল নীলচাষ। শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপে বস্ত্রশিল্পে নীলের জোগান দেয়ার জন্য খাদ্য উৎপাদন বাদ দিয়ে নীল চাষ করতে বাধ্য হত।

তিতুমীর নীলচাষিদের বৃটিশ নীলকর ও জমিদারদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন।ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় বলেন, তিতুমীরের এই সংগ্রাম ছিল প্রকৃত বিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবরা। অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে তিতুমীরের এই বিদ্রোহ পরিচিত ‘বারাসাতের বিদ্রোহ’ নামে। তিনিও হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো অধ:পতিত মুসলমান সমাজে সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন।

বাঁশের কেল্লা নির্মাণ


১৮৩১ সালে বারাসতের কাছে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে বাঁশের কেল্লা নামে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। বাঁশ ও কাদা মাটি দিয়ে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট এই কেল্লা তৈরি করেন। এটি ছিল তার সামরিক কেন্দ্র যেখানে অস্ত্র মজুদ রাখা হতো এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। অর্থাভাবে বাঁশের তৈরি হলেও এর কাঠামো দুর্বল ছিল না। এটি একাধিক প্রকোষ্ঠে বিভক্ত ছিল এবং খাদ্যদ্রব্য ও অস্ত্র রাখার প্রকোষ্ঠ ছিল।

তিতুমীর ছিলেন দূরদর্শী। বাঙ্গালীদের একত্র করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সচেতন করে সবার হাতে বাঁশ তুলে দেন। গ্রামের পথে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা বাঁশই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র। সেই আমলে আধুনিক অস্ত্রের সাথে বাঙ্গালিরা পরিচিত ছিল না। বাঁশই বাঙ্গালিদের বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা দেখে ইংরেজ বাহিনীতে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়ে যায়।

বারাসাতের যুদ্ধ ও তিতুমীরের মৃত্যু


তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নিজেকে বাদশাহ করে মৈনুদ্দিন নামে জনৈক ওয়াহাবীকে প্রধানমন্ত্রী ও তার ভাগ্নে গোলাম মাসুমকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। বৃটিশ বাহিনী ও জমিদাররা কয়েকবার পরাজিত হয়। এ বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষক সেনা অংশ নেয়। তন্মধ্যে বারাসাত বিদ্রোহ অন্যতম।

অবশেষে ১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর বৃটিশ সৈন্যরা তাদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিতুমীর স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন, ভাইসব একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে। লড়াইয়ে হার-জিত থাকবে, এতে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যাদা অনেক। আমরা শুরু করলাম, এ পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।

১৪ নভেম্বর কর্ণেল হার্ডিং এর নেতৃত্বে বৃটিশ সৈন্যরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। এ বাহিনীতে ১০০ অশ্বারোহী, ৩০০ স্থানীয় পদাতিক, দুটি কামান সহ গোলন্দাজ সৈন্যের এক নিয়মিত বাহিনী অংশ নেয়। বিপরীতে সাধারণ তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা বৃটিশ সৈন্যদের অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি।

১৯ নভেম্বর তিতুমীর ও তার চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। কামানের গোলা বর্ষণে কেল্লা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। তার বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁকে ফাঁসি দেয়া হয় এবং ৩৫০ জন বিপ্লবীকে বন্দি করা হয়। বাঁশের কেল্লা গুড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তাই বলে তারা হার মানেনি। সর্বপরি এটি ছিল বাংলার মাটিতে বৃটিশ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার চেষ্টা।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url