কাশ্মীর যেন সত্যিকারের স্বপ্নের ভূস্বর্গ
সৌন্দর্যের লীলাভূমি কাশ্মীর যেন সত্যিকারের স্বপ্নের ভূস্বর্গ। ভূস্বর্গ বলতে বোঝানো হয় কাশ্মীরের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে, যা মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রথম ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ হিসাবে অভিহিত করেন।সবুজ উপত্যকা, বরফঢাকা হিমালয়, লেকের স্বচ্ছ হ্রদ ও রঙিন টিউলিপ বাগানের কারনে এটি স্বর্গীয় রুপ লোভ করেছে।
কাশ্মীর শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল জল থেকে উদ্ভূত ভূমি
কাশ্মীর নামটি সংস্কৃত শব্দ কাশ্মীরা থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়।স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে কাশ্মীর শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল ‘জল থেকে উদ্ভূত ভূমি’। লোক ভাষ্য মতে কাশ্মীর শব্দটি এসেছে বৈদিক ঋষি ‘কাশ্যপ’ এর নাম থেকে। যিনি এই ভূমিতে মনুষ্য বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তদনুসারে কাশ্মীর শব্দটি এসেছে কাশ্যপের হ্রদ অথবা পর্বত শব্দ থেকে।
প্রাচীন গ্রীকরা এই অঞ্চলটিকে কাষ্পেরিয়া নামে অভিহিত করত। টলেমির কাসপিরিয়া দেশ বলতে কাশ্মীরকেই বুঝানো হয়েছে। বৌদ্ধ পণ্ডিত এবং চীনা ভ্রমণকারী হুয়েনসাং কাশ্মীরকে কিয়া-শি-মিলো নামে অভিহিত করেন।খৃস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে সংস্কৃত ব্যাকরনবিদ পাণিনি রচিত অষ্টাধ্যয়ী গ্রন্থে কাশ্মীর নামটি উল্লেখ করে। পাণিনি কাশ্মীরের জনগণকে কাশ্মীরিকা বলে অভিহিত করেন।
প্রথম সহাস্রাব্দের শুরুর দিকে কাশ্মীর অঞ্চলে হিন্দু ধর্ম এবং পরে বৌদ্ধ ধর্মালম্বী লোকজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি গড়ে ওঠে। ৭ম থেকে ১৪ শতকের সময় অঞ্চলটি হিন্দু রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়েছিল। ১৩৩৯ সালে শাহ মীর কাশ্মীরের প্রথম মুসলিম শাসক হন এবং শাহ মীর রাজবংশের উদ্বোধন করেন। অঞ্চলটি ১৫৮৬ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। পরবর্তিতে ১৮২০ সাল পর্যন্ত আফগান দুররানি সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত হয়েছিল।
কাশ্মীর হল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরপশ্চিমের একটি অঞ্চল। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত কাশ্মীর শব্দটি ভৌগলিকভাবে শুধু হিমালয় পর্বতমালা এবং পীর পঞ্জল পর্বতমালার উপত্যকাকে নির্দেশ করা হতো। আজ কাশ্মীর বলতে বোঝায় একটি বিশাল অঞ্চল যা ভারত শাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর ও লাদাখ। পাকিস্থান শাসিত গিলগিত-বালতিস্থান ও আজাদ কাশ্মীর প্রদেশ এবং চীন শাসিত কিছু অঞ্চলসমূহ নিয়ে গঠিত।
১৮২০ সালে মহারাজ রঞ্জিত সিং কাশ্মীরকে শিখ সাম্রাজ্যভূক্ত করে। ১৮৪৬ সালে প্রথম এ্যাংলো-শিখ যুদ্ধে শিখদের পরাজয়ের পর এবং অমৃতসর চুক্তির মাধ্যমে বৃটিশদের কাছ থেকে এই অঞ্চল কেনার পর, জম্মুর রাজা গুলাব সিং কাশ্মীরের নতুন শাসক হন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এই শাসন। এই বিভাজনের পর ভারত, পাকিস্থান ও চীন এই তিন দেশই কিছু বা সম্পূর্ণ অংশ দাবী করলে বিতর্কিত অঞ্চলে পরিণত হয়।
পাকিস্থানের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল ‘পাকিস্থান-অধিকৃত কাশ্মীর’ আর ভারত দ্বারা শাসিত কাশ্মীরের অংশকে ‘ভারত-অধিকৃত কাশ্মীর হিসাবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৪৭ সালের পর ১৯৬৫ সালে পাকিস্থান ও ভারতের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। ব্যাপক প্রাণহানী হয় দু দেশের সেনাদের। এ দিকে ভারত পাকিস্থান বিরোধের মধ্যে ১৯৬২ সালে এ অঞ্চলের উপর চীনের নজর পড়ে। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে বিশেষ মর্যাদার শর্তে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয় জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ।
কাশ্মীরের মনোমুগ্ধকর দর্শনীয় স্থান সমূহ
শ্রীনগর শহর : এ শহরের ভিতর রয়েছে ডাল লেক, নাগিন লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, টিউলিপ গার্ডেন, নিশাত বাগ, শালিমার বাগ, চাশমেশাহী বাগ, পরিমহল, হযরত বাল দরগাহ, শংকরাচার্যহিল। এই জায়গাগুলি এক দিনেই ঘুরে দেখা সম্ভব।
পাহেলগাম : শ্রীনগর থেকে প্রায় ৯৭ কি.মি. দুরে অবস্থিত। রাস্তার দুপাশে পড়বে শুধু আপেলের বাগান। জুলাই থেকে অক্টোবর এই সময়ের মধ্যে গাছে গাছে আপেল দেখা যায়। ছোট গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে বেড়াতে হয়।
সোনমার্গ : শ্রীনগর থেকে ৪২ কি.মি দূরে অবস্থিত দ্রাস, কারগিল ও লাদাখ। সেখানে পৌছাতে পথে পড়বে অপরূপ সিন্ধু নদ, অনেক সুন্দর উপত্যকা ও ঝর্ণা। ঘোরার মধ্যে জাজিলা পাস, খাজিওয়াস গ্লেসিয়ার, গঙ্গাবাল লেক, গাদসার লেক, ভিসান্তার লেক, সাসতার লেক ইত্যাদি অন্যতম। এসবের বাইরে দুধপত্রী, কোকরনাগ, ডাকসুম কিংবা সিনথেনটপের সৌন্দর্য আরও মনোমুগ্ধকর। আহারবালের জলপ্রপাতটিও অনন্য এক গন্তব্য।
গুলমার্গ : সারা বছর বরফের জন্য বিখ্যাত। শ্রীনগর থেকে ৫২ কি.মি. দূরে অবস্থিত। যাওয়া আসাতে প্রায় সারা দিন লেগে যায়। ওখানে দুই ধাপের কেবল কার বা রোপওয়ে আচে। নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে গেলে একধাপ উঠলেই বরফ দেখা যায়। আর বাকি সময় দ্বিতীয় ধাপে উঠলে বরফ দেখা যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় রাজা ইউসুফ শাহ চাক এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের পছন্দের অবকাশযাপনের স্থান ছিল গুলবার্গ। কালের বিবর্তনে নাম হয়ে যায় গুলমার্গ।
আজও কাশ্মীর অমীমাংসিতই রয়ে যায়
কাশ্মীর জাতিগতভাবে বৈচিত্রময় হিমালয়াঞ্চলীয় এলাকা। চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।টলটলে পানির হ্রদ, সবুজ উপত্যকা ও বরফে ঢাকা পাহাড়ের জন্য এটি বিখ্যাত। লর্ড মাউন্টব্যাটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৭ সালে দেশ দুটির স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু কাশ্মীর অমীমাংসিতই থেকে যায়। সে সময় কাশ্মীরের রাজা ছিল হরি সিং। ভারত বা পাকিস্থানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ অঞ্চলটিকে।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্থানি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার মুখে তিনি ভারতের সহায়তা চান। সেই সুযোগে কাশ্মীরের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা দখল করে নেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। ভারত ও পাকিস্থান ছাড়াও চীনের নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে কিছু এলাকা, যা আকসাই চীন নামে পরিচিত।পরে ১৯৭২ সালে শিমলা চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা মেনে চলতে রাজি হয় ভারত ও পাকিস্থান।
সিমলা চুক্তির পরও ১৯৯৯ সালে কাশ্মীর নিয়ে আরেক দফা যুদ্ধে জড়ায় এ দুটি দেশ। রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইসহ নানা কারনে কাশ্মীরের জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা স্বাধীন হতে চায়। ৮০ দশকের শুরু থেকে তীব্র হতে শুরু করে বিক্ষোভ- আন্দোলন। এসব বিক্ষোভ দমন করতে বহু সেনা মোতায়েন করে ভারত সরকার। পৃথিবীর স্বর্গ হয়ে ওঠে মৃত্যু উপত্যকা। প্রাণ যায় হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের।
২০১৬ সালে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৯ ভারতীয় সেনা নিহত হলে পাকিস্থান সীমান্তে সার্জিকাল স্ট্রাইক চালায় ভারত। ২০১৯ সালে পুলওয়ামায় নিহত হয় আরও ৪০ ভারতীয় সেনা। ভারত হামলা চালায় পাকিস্থানের বালাকোটে। এ সময় সবচেয়ে বড় উত্তেজনা দেখা যায় এ দু দেশের মধ্যে। বাতীল করা হয় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা আইন। ২০০৩ সালে দু দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও কার্যত কোনো শান্তি আলোচনা সফল হয় নি।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url